স্থূলতা (Obesity) নিয়ন্ত্রণে যা জানা প্রয়োজন

স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে জানুন

55 বার পড়া হয়েছে

আমরা সকলেই সামঞ্জস্যপূর্ণ শারীরিক গঠনের দেহ পছন্দ করি,তা না হলেও স্থূল নয় এমন শরীর আমাদের পছন্দ। কারণ স্থূলতা (Obesity) শুধুমাত্র বাহ্যিক চিন্তার কোন বিষয় নয় এর সাথে জড়িত আছে অনেক শারীরিক অসুস্থতা যা আমাদের মৃত্যুমুখী করে ফেলতে পারে যেমন হৃদযন্ত্রের অসুখ, বহুমূত্র, উচ্চ রক্তচাপ সহ আরো অন্যান্য আসুখ। স্থূলতা একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে শরীরে প্রচুর পরিমাণে চর্বি জমা হতে থাকে এবং তা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে যার জন্য দায়ী অস্বাভাবিক চর্বি (Adipose) কোষকলার আয়তন বৃদ্ধি যেখানে চর্বি কোষ গুলোর আকার বা সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে অথবা দুইটি ঘটনাই একসাথে ঘটে। 

স্থূলতা একটি রোগ যা শরীরের বেশির ভাগ সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। এটি হার্ট, লিভার, কিডনি, জয়েন্ট এবং প্রজনন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কার্ডিও ভাস্কুলার রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা গুলোর জন্য দায়ী। স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোভিড-19 এর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা তিনগুণ বেশি। 

বৈশ্বিক স্থূলতার প্রাদুর্ভাব 

১৯৭৫ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বে স্থূলতার সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন(WHO) এর তথ্য মতে এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ বর্তমানে স্থূলতায় ভুগছেন যার মধ্যে ৬৫০ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক, ৩৫০ মিলিয়ন কৈশোর এবং বাচ্চা হচ্ছে ৩৯ মিলিয়ন। ধারণা করা হচ্ছে যে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৬৭ মিলিয়নের কম প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশু সুস্থ থাকবে কারণ অধিকাংশ মানুষ অতিরিক্ত ওজনবিশিষ্ট বা স্থূল থাকবে। বিশ্ব স্থূলতা দিবস ২০২২ উপলক্ষে, WHO বিশ্বের দেশগুলোকে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলার জন্য আরো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমান স্থুলতা নিয়ে তেমন কোন সমীক্ষা না থাকলেও স্থূল ব্যক্তির সংখ্যা মোটেও কম নয়। ২০১৪ সালের ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী বাচ্চাদের উপর একটি সমীক্ষায় ৩.৫ % বাচ্চাই ছিল এবং ৭.৫% বাচ্চা অতিরিক্ত ওজন বিশিষ্ট ছিল। এছাড়া University of Washington এর institute for health metrics and evaluation(IHME) এর মতে ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের ৭% প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৩% শিশু অতিরিক্ত ওজন ছিল। আরো জানা যায় যে ২০১৩ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৭% হয় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এবং ৪.৫% হয় শিশুদের জন্য। 

বিভিন্ন ধরনের স্থূলতা 

স্থূলতাকে সর্বপ্রথমে সহজ উপায়ে দুইভাবে ভাগ করা যায়, মুখ্য  স্থূলতা এবং গৌণঃস্থূলতা। মুখ্য স্থূলতা হচ্ছে এমন স্থূলতা যার জন্য দায়ী প্রয়োজনের তুলনায় অধিক খাবার গ্রহন যা প্রতিদিনের খাদ্য চাহিদা বা ক্যালরির তুলনায় অধিক বেশি। অপরদিকে গৌণ স্থূলতা যার জন্য দায়ী কোন জন্মগত ত্রুটি, বিপাকীয় অসামঞ্জস্যতা, জেনেটিক ভিন্নতা অথবা মানসিক কোন রোগ। 

শারীরিক আকার এবং দৈহিক চর্বি বিন্যাসের ভিত্তিতে স্থূলতাকে আরও দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যার একটি হলো গাইনয়েড স্থূলতা যা নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যেখানে নারীদের শরীরের আকৃতি নাশপাতি ফল এর আকৃতির মত হয়ে যায়। অন্যটি হচ্ছে এন্ড্রয়েড স্থূলতা, আপেল আকৃতির দৈহিক গঠন এক্ষেত্রে পুরুষের মধ্যে দেখা যায়। এখানে পুরুষের শরীরের উপরের অংশে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। 

স্থূল কিনা বুঝার উপায় 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে, কোন মানুষের বিএমআই(BMI-Body mass index) থেকে জানা যায় তিনি কি স্থূলতায় ভুগছেন কিনা। বিএমআই ১৮.৫ এর নিচে হলে ব্যক্তিটি ওজন হীনতায় ভুগছেন, ১৮.৫-২৪.৯ এর মধ্যে হলে আদর্শ ওজনের অধিকারী, ২৫-২৯.৯ ব্যক্তিটির ওজন বেশি, ৩০-৩৪.৯ হলে স্থূলতার প্রথম পর্যায়ে আছেন, ৩৫-৩৯.৯ হলে স্থূলতার দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যক্তিটির অবস্থান এবং ৪০ এর বেশী হলে ব্যক্তিটি অতিরিক্ত স্থূলতায় ভুগছেন।

কোন ব্যক্তি চাইলে নিজেই নিজের বিএমআই নির্ণয় করতে পারবেন৷ এটি নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিটির দৈহিক ওজন (কিলোগ্রাম এককে) এবং ব্যক্তিটির উচ্চতা (মিটার একক)। দৈহিক ওজন ও উচ্চতার বর্গের অনুপাতেই হলো তার বিএমআই।

বিএমআই = ওজন(কিলোগ্রাম)/উচ্চতা^২(মিটার^২)

অর্থাৎ ১.৭ মিটার উচ্চতার একজন ব্যক্তি যদি ৮০ কেজি ওজন বিশিষ্ট হয় তবে তার বিএমআই ২৭.৭। অর্থাৎ ওই ব্যক্তিটি ওজন বেশি গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। ওই ব্যক্তির সঠিক দৈহিক ওজনের সীমা হল ৫৩.৪ থেকে ৭২.১ কেজি।

স্থূলতার কারণসমূহ 

অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ

বেশি পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ সাময়িকভাবে অস্বস্তি সৃষ্টি করলেও দীর্ঘদিনে তা ওজন বৃদ্ধি করতে থাকে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ ডেকে আনে শারীরিক স্থূলতা। দৈনিক খাদ্য চাহিদার অতিরিক্ত খাদ্য দেহে জমা হয় চর্বি হিসেবে। 

খাদ্য তালিকায় চর্বিযুক্ত খাদ্যের প্রাধান্য

খাদ্য তালিকার অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাদ্যের ফলে স্নেহ জাতীয় কোষ কলা এর মধ্যে জমা হতে থাকে চর্বি সমূহ। যার শরীরের চর্বির আয়তন বাড়িয়ে দেয় ফলে তা স্থূলতায় রূপ নেয়। 

অলস জীবন যাপন 

কম পরিমাণে শারীরিক কায়িকশ্রমের ফলে দৈনিক খাদ্যের মাধ্যমে শক্তি গ্রহণ এবং শক্তি ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। বেশি পরিমাণে খাদ্যের মাধ্যমে শক্তি গ্রহণ এবং কম পরিমাণে শক্তি ব্যয়ের ফলে অতিরিক্ত শক্তি স্নেহ জাতীয় পদার্থ হিসেবে শরীরে জমা পড়ে। 

জেনেটিক্স 

প্রাণীর দেহের সকল ক্রিয়াকলাপ ক্রোমোজোম এ অবস্থিত জিনের উপর নির্ভর করে। জিনের ত্রুটি  অথবা ধরন কিছু বিরল জেনেটিক অবস্থা রয়েছে যা স্থূলতার কারণ হতে পারে, যেমন প্রাডার-উইলি সিনড্রোম। পিতামাতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য – যেমন প্রচুর ক্ষুধা পাওয়া স্থূলতার দিকে ধাবিত করে। 

বিভিন্ন রোগ অথবা শারীরিক অবস্থা

কিছু ক্ষেত্রে,শারীরিক অবস্থা ওজন বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।  এর মধ্যে রয়েছে আন্ডারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড গ্রন্থি (হাইপোথাইরয়েডিজম)- যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করে না যা মূলত বিপাক হার নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়াও কুশিং সিনড্রোম – একটি বিরল ব্যাধি যা স্টেরয়েড হরমোনের অতিরিক্ত উৎপাদন ঘটায়। স্টেরয়েড  হরমোন গুলো দেহের ওজন বৃদ্ধি এবং স্নেহ জাতীয় পদার্থ সঞ্চিত হওয়ার জন্য দায়ী।

ঔষধ যা ওজন বৃদ্ধি করে 

কিছু কিছু ওষুধ, যার মধ্যে কিছু কর্টিকোস্টেরয়েড, মৃগীরোগ এবং ডায়াবেটিসের ওষুধ এবং মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত কিছু ওষুধ – এন্টিডিপ্রেসেন্ট এবং সিজোফ্রেনিয়ার ওষুধ সহ অন্যান্য ঔষধ যা  ওজন বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।

স্থূলতার কারণে কি কি রোগ হতে পারে

স্থূলতা যেকোনো সময় স্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। স্থূল অবস্থা মানব শরীরের অন্যতম দুর্বল অবস্থা যার থেকে দেহে বাসা বাঁধতে পারে বিভিন্ন ধরনের মৃত্যুমুখী রোগ। স্থূল ব্যক্তিদের হৃদ যন্ত্রের অসুখে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কারণ স্থূল ব্যক্তির দেহের রক্তে উচ্চ ঘনমাত্রা চর্বির পরিমাণ হ্রাস প্রায় যা মানব দেহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় চর্বি কারণ এইগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের হরমোন সৃষ্টি হয়। অপরদিকে রক্তে উপস্থিত নিম্ন ঘনমাত্রার চর্বি ও ট্রাই গ্লিসারলের পরিমাণ বহু গুণে বৃদ্ধি পায় যা মানব শরীরের জন্য খারাপ। যার ফলে নিট চর্বির পরিমাণ রক্তে বৃদ্ধি পায় যা প্রথমে উচ্চ রক্তচাপ এবং পরবর্তীতে হৃদ যন্ত্রের বড় কোন অসুখের প্রধান কারণ হতে পারে। 

টাইপ-২ ডায়াবেটিস এমন একটি অসুখ যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি হয় না অথবা দেহ ইনসুলিনের উদ্দীপনায় সারা দেয়না। স্থূল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন অগ্ন্যাশয় থেকে উৎপাদিত হয়না বা উৎপাদিত হলেও তা উদ্দীপনা সৃষ্টিতে সক্ষম নয় যার ফলে স্থূল ব্যক্তি বহুমূত্র রোগের ঝুঁকিতে থাকেন। 

স্থূলতায় দেহে প্রদাহজনিত উপাদান (inflammatory cytokines) এর পরিমাণ স্বাভাবিক এর চেয়ে বেশি পরিমাণে দেখা যায়। প্রদাহ জনিত উপাদান আমাদের শরীরে তখনই বৃদ্ধি পায় যখন আমাদের শরীরে কোন প্রদাহ তৈরি হয়, কিন্তু স্থলে ব্যক্তিদের এই উপাদান স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে বলে তাদের শরীরে সক্রিয়ভাবে অভ্যন্তরীণ প্রদাহ হতে থাকে। 

বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা আমাদের শরীরে সংবাহিত হওয়ায় এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া প্রদানের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নিউরন কোষ। স্থুল ব্যক্তিদের নিউরন কোষ গুলো উদ্দীপনা গ্রহণ এবং সংবহনের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায় যার ফলে ঠিকমত উদ্দীপনা গ্রহণ এবং সে অনুযায়ী সাড়া প্রদানে ব্যর্থ হয়। 

স্থূলতায় হাড়ের ক্যালসিয়ামের ঘনত্ব হ্রাস পেতে থাকে যার ফলে পরবর্তীতে ভঙ্গুর হাড় তৈরি হওয়ার ও হাড় জনিত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এখানে দেহের হারের ক্যালসিয়ামের পুনরায় রক্তে পুনঃ শোষণ ঘটতে থাকে যার ফলে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে। এই ঘটনাকে অস্টিওলাইসিস অথবা অস্টিওপরেসিস বলা হয়। অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামের পুনঃশোষনের ফলে দন্তক্ষয় (Periodontitis) হতে পারে। 

বিভিন্ন ধরনের ঔষধ যা স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়

স্থুলতায় রক্তে উপস্থিত বিভিন্ন  বায়োকেমিক্যাল এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যা সরাসরি স্থুলতা তৈরীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এ সকল উপাদানকে নিয়ন্ত্রণের জন্য শারীরিক ব্যায়ামের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপের আন্টি লিপিডেমিক ঔষধ ব্যবহৃত হয়। 

অ্যান্টি লিপিডেমিক ঔষধ 

১) স্ট্যাটিন গ্রুপ  (Statin group)

এই গ্রুপের ওষুধগুলি রক্ত উপস্থিত নিম্ন ঘনমাত্রার চর্বির কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ কমিয়ে দেয় যা মানব শরীরের জন্য ব্যাড কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত  এবং উচ্চ ঘনমাত্রার চর্বির কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যা গুড কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত । 

  • এটরভাস্টাটিন(Atorvastatin)
  • সিমভাস্টাটিন(Simvastatin)
  • ফ্লুভাস্টাটিন (Fluvastatin)
  • লোভাস্টাটিন (Lovastatin)

এই ওষুধ গ্রহণের ফলে অনেকের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। পেট ফাঁপা, মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা হতে পারে। এছাড়াও এ ওষুধ গ্রহণে মূলত কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে যা সমাধানে প্রচুর পানি ও আঁশ জাতীয় শাকসবজি খেতে হবে। খুব অল্প সংখ্যক রোগী এ ওষুধ সেবনে মাসেল প্লাজম, রেবডোমাইলোসিস এবং ইনফেকশনের সম্মুখীন হতে পারে। 

২) কোলেস্টেরল অ্যাবসরপশন ইনহিবিটর (Cholesterol absorption inhibitor)

এই গ্রুপের ওষুধ কোলেস্টেরলকে ক্ষুদ্রান্ত হতে শোষণে বাধা দেয়। ফলে শরীরে কম পরিমাণ ফ্যাট শোষণ হয়। 

  • ইজেটিমাইব(ezetimibe)

এ ওষুধ সেবনে মূলত ডায়ারিয়া, কফ, সাইনুসাইটিস, পেশীতে ব্যথা এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে লিভার টক্সিসিটি দেখা দিতে পারে। 

৩) বাইল এসিড সিকিউরেসট্র‍্যান্টস (Bile acid sequestrants)

এই ওষুধগুলো ক্ষুদ্রান্তের বাইল এসিডের সাথে যুক্ত হয়ে অদ্রবনীয় জটিল গঠন করে যা মলের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। ফলে শরীরে বাইল এসিডের পরিমাণ কমে যায় যা পূরণের জন্য রক্তের কোলেস্টোরাল হতে বাইল এসিড তৈরি হতে থাকে। এর ফলে রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমতে থাকে। 

  • কোলেসেভেলাম(Colesevelam)
  • কোলেসট্রামাইন(Cholestyramine)

এই ওষুধ ব্যবহারে পেটে ব্যথা, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহারে রক্তক্ষরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এবং উচ্চমাত্রায় দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। 

৪) ফাইব্রিক এসিড ডেরিভেটিভ (Fibric acid derivative)

এই ওষুধগুলো মূলত ট্রাইগ্লিসারাইড এর উৎপাদন ও পরিবহনে বাধা দেয়। সেই সাথে উচ্চ ঘনমাত্রার চর্বির কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যা গুড কোলেস্টেরল বা হ্যাপি কোলেস্টেরল নামে পরিচিত। 

  • জেমফাইব্রাজিল(Gemfibrozil)
  • ফেনোফ্রাইব্রেট(Fenofibrate)

এই ওষুধ সেবনে অন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা,  পেশিতে ব্যথা এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে পিত্তথলিতে পাথর, লিভার টক্সিসিটি দেখা দিতে পারে। 

৫) ওয়াটার সলিউবল ভিটামিন – নিয়াসিন (Niacin)

এটি মূলত পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন বি৩। উচ্চ পরিমাণ এটি ব্যবহারে শরীরে লিপোপ্রোটিন এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের  উৎপাদন কমে যাবে। এই ওষুধ সেবনে অন্ত্রের অবনতি, চুলকানি, এবং রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। 

৬) ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড (Omega-3 fatty acids)

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হলো eicosapentaenoic অ্যাসিড এবং docosahexaenoic অ্যাসিড যা লং-চেইন পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, যা সাইক্লো-অক্সিজেনেস এবং লাইপোক্সিজেনেস পাথওয়েতে অন্তর্ভুক্তির জন্য অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিডের সাথে প্রতিযোগিতা করে। তাদের ক্রিয়াকলাপের মধ্যে রয়েছে হাইপোলিপিডেমিক অ্যাকশন (বিশেষ করে প্লাজমা ট্রাইগ্লিসারাইডের হ্রাস) খুব কম ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন হ্রাস করে।

৭) পিসিএসকেজি ইনহিবিটর (PCSKG inhibitors)

এই গ্রুপের ওষুধগুলো  মানব মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি(IgG2 আইসোটাইপ) যা প্রোটিন কনভার্টেজ সাবটিলিসিন কেক্সিন টাইপ 9 (PCSK9) এর সাথে যুক্ত হয়। এটি PCSK9 কে যকৃতের লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন রিসেপ্টরগুলির সাথে আবদ্ধ হতে বাধা দেয় যার ফলে রিসেপ্টরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যার ফলে নিম্ন ঘনমাত্রার চর্বির -কোলেস্টেরলের গ্রহণ বেড়ে যায় ফলে রক্তে এর মাত্রা কম হয়।

  • ইভোলোকিউম্যাব(Evolocumab)
  • এলিরোকিউম্যাব(Alirocumab)

ওষুধ সেবনে এলার্জি প্রতিক্রিয়া, কাশি, মূত্রনালীর সংক্রমণ, সাইনোসাইটিস, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, পেশী ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি এবং পেশীর খিঁচুনি হতে পারে।

যাদের বিএমআই খুবই বেশি বিশেষজ্ঞরা তাদেরকে এন্টি ওবেসিটি ঔষধ ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। অথবা একটি এনটিঅবেসিটি ঔষধ এবং অপর আরেকটি এন্টিলিপিটিপি ঔষধ সাথে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামের পরামর্শ দিয়ে থাকে।

কাজের ধরণের উপর ভিত্তি করে স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ করার ওষুধের (anti-obesity drugs) শ্রেণিবিভাগ

১) ঔষধ যা অন্ত্রের ফ্যাট শোষণকে বাধা দেয় (Drug inhibiting intestinal fat absorption)

  • অরলিস্ট্যাট (Orlistat)

২) ক্ষুধা নিবারক ওষুধসমূহ (Appetite suppressant)

এর মধ্যে এমন ওষুধ রয়েছে যা নিউরোট্রান্সমিটারের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের রিসেপ্টরগুলিতে কাজ করে যাতে ক্ষুধা দমন করা যায়।  উদাহরণ নিম্নলিখিত অন্তর্ভুক্ত:

 ক) নর-এড্রেনার্জিক ওষুধ (Noradrenergic drugs): 

  • ফেনাইলপ্রোপানোলামাইন (Phenylpropanolamine)
  • অ্যামফিটামিন (Amphetamine)
  • ফেনটারমাইন (Phentermine) 
  • ডাই-ইথাইলপ্রোপিয়ন (Diethylpropion)

খ) সেরোটোনিনারজিক ওষুধ (Serotoninergic drugs):

  • ডেক্সফেনফ্লুরামাইন (Dexfenfluramine)
  • ফেনফ্লুরামাইন (Fenfluramine 

 গ) সেরোটোনিনারজিক এবং অ্যাড্রেনার্জিক ড্রাগ (Serotoninergic and noradrenergic drugs):

  • সিবুট্রামাইন (Sibutramine)

 ঘ) সিলেক্টিভ ক্যানাবিনয়েড টাইপ -1 (CB1) রিসেপ্টর এন্টাগোনিস্ট ( Selective cannabinoid type-1 receptor antagonist):

  • রিমোনাব্যান্ট (Rimonabant)

৩) ওষুধ যা শক্তি খরচ এবং থার্মোজেনেসিস বৃদ্ধি করে (Drugs increasing energy consumption and thermogenesis)

  • এফিড্রিন (Ephedrine)
  • ক্যাফেইন (Caffein)
  • থাইরক্সিন (Thyroxin)

৪) জিএলপি-১ রিসেপ্টর এগোনিস্ট (GLP-1 receptor agonists)

  • লিরাগ্লুটাইড (Liraglutide)
  • এক্সেনাটাইড (Exenatide)
  • ডুলাগ্লুটাইড (Duraglutide)
  • লিক্সিসেনাটাইড (Lixisenatide)

৫) বাইগুয়ানাইড (Biguanide)

  • মেটফরমিন (Metformin)

এটরভাস্টাটিন (Atorvastatin)

যে সকল ব্যক্তি স্থূলতার প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে তাদের জন্য মূলত যে ঔষধগুলো  ব্যবহৃত হয় তাদের মধ্যে স্ট্যাটিন গ্রুপের ওষুধগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। স্টাটিন গ্রুপের ঔষধগুলির মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রেসক্রাইব করা একটি ওষুধ হচ্ছে এটরভাস্টাটিন (Atorvastatin)। মোটামুটি বাংলাদেশের সকল স্বনামধন্য ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এটিকে বাজারজাত করেন। উদাহরণ, 

  • এনজিটর (Anzitor 10/20/40mg) ট্যাবলেট: স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। 
  • এটাসিন (Atasin 10/20/40/80mg): এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
  • এটোভা (Atova 10/20/40mg): বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। 
  • লিপোস্টেট (Lipostat 10/20mg): নাভানা ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড। 

এছাড়াও আরো অন্যান্য ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানি ওষুধটিকে বাজারজাত করেন।

মানব শরীরে এটরভাস্টাটিন যেভাবে কাজ করে 

এটরভাস্টাটিন প্রতিযোগিতামূলকভাবে লিভারের 3-hydroxy-3-methylglutaryl-coenzyme A (HMG-CoA) reductase এনজাইমকে বাধা দেয়। যার ফলে HMG-CoA  হতে মেভালোনেট রূপান্তরিত হতে পারেনা। মেভালোনেট কোলেস্টেরল উৎপাদনে সহায়তা করে, অপরদিকে স্ট্যাটিন ওষুধগুলি লিভারে কোলেস্টেরল উত্পাদন হ্রাস করে। ফলে হাইপারকোলেস্টেরলেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে, এটরভাস্ট্যাটিন রক্তে উপস্থিত মোট কোলেস্টেরল (TC), কম ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন কোলেস্টেরল (LDL-C) কমাতে দেখা গেছে। অপরদিকে উচ্চ-ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন কোলেস্টেরল (HDL-C) বৃদ্ধি করে।

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া 

এই ঔষধ সেবনে অসুস্থ বোধ, বমি বমি ভাব বা বদহজম হতে পারে । মাথা ব্যথা, নাক দিয়ে রক্ত ​​পড়া, গলা ব্যথা, ঠাণ্ডার মতো উপসর্গ যেমন নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ হওয়া বা হাঁচি দেখা দিতে পারে। এছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেট ফাঁপা হতে পারে। 

গর্ভাবস্থা এবং স্তন্যদানে ব্যবহার

এফডিএ (Food and drug administration) এখনও ওষুধটিকে কোন একটি নির্দিষ্ট গর্ভাবস্থা বিভাগে শ্রেণিবদ্ধ করেনি। গর্ভবতী মহিলাদের ব্যবহারের জন্য নিষেধাজ্ঞা আছে যেহেতু গর্ভবতী মহিলাদের সুরক্ষিত কিনা তা এখনো  প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং গর্ভাবস্থায় লিপিড কমানোর ওষুধের কোনও আপাত সুবিধা নেই। 

বুকের দুধ খাওয়ানো বা দুধ উৎপাদনের উপর ওষুধের প্রভাব সম্পর্কে কোন তথ্য নেই।  মানুষের দুধে অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন রয়েছে কিনা তা জানানি। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইঁদুরের দুধে অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন উপস্থিতি আছে ।

অরলিস্ট্যাট (Orlistat)

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে এন্টি ওবেসিটি ওষুধের মধ্যে  সবচেয়ে ব্যবহৃত একটি ঔষধ হচ্ছে অরলিস্ট্যাট (Orlistat)। এটি একটি আইএনএন (International nonproprietary name) ড্রাগ। বাংলাদেশের বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানি বিভিন্ন নামে এই ওষুধটি প্রস্তুত করে থাকেন। যেমন,

  • এডিপোনিল (Adiponil 120mg) ক্যাপসুল: ইনসেপ্টা ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড। 
  • ওলিস্টেট (Olistat 120/60mg) ক্যাপসুল : স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। 
  • ডায়েটিল (Dietil 120mg) ক্যাপসুল : এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
  • ওরনিকেল (Ornical 120mg) ক্যাপসুল : এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
  •  স্লিমফাস্ট (Slimfast 120/60mg) ক্যাপসুল : হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
  • যেনোবেস (Xenobese 120mg) ক্যাপসুল : রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড।

অরলিস্ট্যাট মানব শরীরে যেভাবে কাজ করে

অরলিস্ট্যাট হল স্থূলতা ব্যবস্থাপনার জন্য অন্ত্রের (Gastrointestinal) লাইপেস এনজাইম কে বাধা দানকারী শক্তিশালী এবং নির্দিষ্ট একটি ঔষধ যা খাদ্যের চর্বি শোষণকে বাধা দিয়ে কাজ করে। লাইপেজ এনজাইম এর কাজ হচ্ছে এটি গ্রহনকৃত চর্বিকে ভেঙ্গে ফ্যাটি এসিড এবং মনোগ্লিসারলে পরিণত করে এবং শোষণে সাহায্য কর। এটি মানুষের অন্ত্রে গ্যাস্ট্রিক এবং অগ্ন্যাশয় থেকে উৎপাদিত সক্রিয় লাইপেজ এনজাইম এর সক্রিয় সেরিন অবশিষ্টাংশের সাথে একটি সমযোজী বন্ধন তৈরি করে লাইপেজ এনজাইমকে অকার্যকর করে দেয় । নিষ্ক্রিয় এনজাইমগুলি এইভাবে ট্রাইগ্লিসারাইডের আকারে খাদ্যের চর্বিকে শোষণযোগ্য মুক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড এবং মনোগ্লিসারাইডে ভাঙতে অক্ষম।  যেহেতু অপাচ্য ট্রাইগ্লিসারাইড শোষিত হয় না, ফলে ক্যালোরির ঘাটতি ওজন নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।  তাই এই ঔষধের  কার্যকলাপের জন্য ওষুধকে পদ্ধতিগত শোষণের প্রয়োজন হয় না। 

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া 

সাধারণত সকল রোগী এই ওষুধটি প্রতি ভালো সারা দেয় ।  তবে অরলিস্ট্যাট গ্রহণের পরে তৈলাক্ত মল ত্যাগ, হঠাৎ মলত্যাগ, তৈলাক্ত নির্গমন, মলত্যাগের পরিমান বৃদ্ধি সহ কয়েকটি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। মূলত এটি চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনের শোষণকে বাধা দেয় যার ফলে ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এছাড়াও মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা, অবসাদ, নারীদের ক্ষেত্রে ইরেগুলার ঋতুস্রাব হতে পারে। 

সতর্কতা

রোগীদের খাদ্যের নির্দেশিকা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া উচিত।  অরলিস্ট্যাট বেশি চর্বিযুক্ত খাবারের সাথে গ্রহণ করলে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা বাড়তে পারে (>৩০% চর্বি থেকে ক্যালোরি)। দৈনিক ভোজনে স্নেহ জাতীয় খাবার  তিনটি প্রধান খাবার বেলায় ভাগ করা উচিত।  যদি কোন একটি বেলার খাবার না খেলে, ডোজ বাদ দিতে হবে ।

গর্ভাবস্থা এবং স্তন্যদানে ব্যবহার

গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে এই ওষুধের কোন পর্যাপ্ত এবং ভাল নিয়ন্ত্রিত গবেষণা নেই। এটি গর্ভাবস্থায় ব্যবহারের জন্য সুপারিশ করা হয় না। মানুষের বুকের দুধে অরলিস্ট্যাট নিঃসৃত হয় কিনা তা জানা জায়নি।

স্থূলতা এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্নোত্তর

ওজন বাড়ার সাথে সবচেয়ে বেশি দায়ী খাবার কোনগুলো ?  

ওজন বাড়ার সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পর্কযুক্ত খাবার হচ্ছে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা সমৃদ্ধ খাবার এবং নানাবিধ জাঙ্ক ফুড। গবেষকদের তথ্য মত,  এর মধ্যে রয়েছে আলুর চিপস, চিনি-মিষ্টিযুক্ত পানীয়, মিষ্টি, ডেজার্ট, পরিশোধিত শস্য, লাল মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস।

স্থূলতার সবচেয়ে বড় কারণ কী?

স্থূলতা সাধারণত খুব বেশি খাওয়া এবং খুব কম চলাফেরার কারণে হয়। কেউ যদি উচ্চ পরিমাণে শক্তি, বিশেষ করে চর্বি এবং শর্করা গ্রহণ করেন, কিন্তু ব্যায়াম এবং শারীরিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে শক্তিকে পুড়িয়ে না ফেলেন, তবে অতিরিক্ত শক্তির বেশিরভাগই শরীরে চর্বি হিসাবে সঞ্চিত হবে।

কোন ধরনের খাবার খেলে স্থূলতা রোধ করা যাবে?

পরিমিত আকারে যেকোনো খাদ্য গ্রহণে স্থুলতা রোধ করা সম্ভব। তবে পুরো শস্য যেমন ওটস, বাদামী চাল, কুইনোয়া সাথে রঙিন শাকসবজি (আলু নয়),পুরো ফল (ফলের রস নয়)

 বাদাম, বীজ, মটরশুটি এবং প্রোটিনের অন্যান্য স্বাস্থ্যকর উৎস যেমন মাছ এবং উদ্ভিদ তেল (জলপাই এবং অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেল)। মাছের এবং বাদামের তেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি এবং সিক্স ফ্যাটি এসিড যা শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে বাধা দেয়। 

নারী ও পুরুষের মধ্যে স্থূলতার হার কদের বেশি?

সাম্প্রতিক ফলাফল অনুযায়ী বেশিরভাগ দেশে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে স্থূলতা বেশি, তবে কিছু দেশ এবং জনসংখ্যার উপগোষ্ঠীতে এই ব্যবধান আরও প্রকট।  তবে স্থূলতার সাথে অন্য অসুখ যেমন টাইপ 2 ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ সহ বেশ কিছু স্থূলতা-সম্পর্কিত কমরবিডিটি রোগে আক্রান্ত হয়ে পুরুষের মৃত্যুর হার বেশি। 

এটরভাস্টাটিন সেবন কালে অন্য কোন ঔষধ গ্রহণ করা যাবে কিনা? 

অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন সাইটোক্রোম P450 3A4 (CYP3A4) দ্বারা সক্রিয় মেটাবোলাইটে পরিণত হয়। যে সকল ঔষধের বিপাক CYP3A4 এনজাইম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় অথবা যে সকল ঔষধ এই এনজাইম কে বাধা দেয় বা এনজাইমের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় তাদেকে এই ঔষধের সাথে সেবন করা যাবে না। CYP3A4 বাধাদানকারী অর্থাৎ ইনহিবিটর যেমন HIV বা HCV প্রোটেজ ইনহিবিটরস (HIV protease inhibitors), ইট্রাকোনাজল (Itraconazole), ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন (Clarithromycin), ফেনোফাইব্রেট (Fenofibrate), কোলচিসিনস (Colchicines), লোপিনাভির (Lopinavir), রিটোনাভিরের (রিটোনাভির) ঔষধ গুলো স্ট্যাটিন গ্রুপের ড্রাগ গুলোর বিপাক হার কমিয়ে দেয় ফলে রক্তে সক্রিয় মেটাবলাইট এর পরিমাণ কমে যায়।  অপরদিকে CYP3A4 এনজাইমের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যেমন রিফামপিসিন (Rifampicin), ইফাভিরেজ (efavirenz) এর সাথে ওষুধটি গ্রহণ করলে রক্তের প্লাজমায় ওষুধটির সক্রিয় মেটাবলাইটের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়।

কোন কোন ব্যক্তি এটরভাস্টাটিন গ্রহণ করতে পারবেন না? 

যে সকল ব্যক্তিদের যকৃতের সমস্য, এলকোহল পানকারী, গর্ভবতী নারী, স্তনদানকারী নারী, যাদের হাইপোথাইরয়েডিজম আছে তারা এই ওষুধটি সেবন করতে পারবেন না। 

ওরলিস্ট্যাট কি অন্যান্য ওষুধের সাথে সমস্যা করে?

ওরলিস্ট্যাট অনেক ওষুধের সাথে যেমন ওয়ারফারিন (warfarin), অ্যামিওডারোন (amiodarone), সাইক্লোস্পোরিন (Cyclosporin) এবং থাইরক্সিনের (Thyroxin) পাশাপাশি ফ্যাট-দ্রবণীয় ভিটামিন শোষণে হস্তক্ষেপ করে, তাদের জৈব উপলব্ধতা এবং কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে।

যে সকল ব্যক্তি ওরলিস্টেট গ্রহণ করতে পারবেন না? 

থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যায় ভুগছেন, যকৃতে সমস্যা, গর্ভবতী এবং দুগ্ধ দানকারী নারী এবং যাদের অন্ত্রে সমস্যা আছে তারা এর ওষুধ গ্রহণ করতে পারবেন না। 

অ্যালকোহল সেবন কি স্থূলতা বৃদ্ধি করে? 

অতিরিক্ত মদ্যপান এবং মদ্যপান শরীরের অতিরিক্ত ওজনের সাথে সম্পর্ক বহন করে। অ্যালকোহল গ্রহনে কিশোর, বয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্কদের অতিরিক্ত ওজন এবং রক্তে উপস্থিত চর্বির পরিমন বৃদ্ধি হয়ে থাকে।

ঘুম এবং স্থূলতা, এরা কি পরস্পর সম্পর্কিত? 

একটি ভাল রাতের ঘুম হল সুস্বাস্থ্যের অন্যতম চাবিকাঠি-এবং একটি স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চাবিকাঠিও হতে পারে।  এমন প্রমাণ রয়েছে যে যারা খুব কম ঘুমায় তাদের ওজন বৃদ্ধি এবং তারা স্থূলতার ঝুঁকিতে বেশি থাকে অন্যদের তুলনায় যারা রাতে সাত থেকে আট ঘন্টা ঘুমায়। এছাড়াও রাতে নিদ্রাহীনতা স্থূলতার একটি প্রধান কারণ। 

স্থুলতা নিয়ন্ত্রণে করণীয় 

  • পরিমিত পরিমাণের সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত 
  • তেল চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ হতে বিরত থাকা উচিত 
  • দৈনিক খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ফলমূল ও শাকসবজি রাখতে হবে 
  • নিয়মিত শারীরিক চর্চা ও ব্যায়াম করতে হবে 
  • ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সাথে স্ক্রিনিং টাইম কমাতে হবে 
  • প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পরিণত পরিমাণে ঘুমাতে হবে  
  • ধূমপান এবং মদ্যপান পরিহার করা 
  • প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা 

পরিশেষে বলা যায় যে, স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নিয়মমাফিক জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও চলাফেরা করা। 

তথ্যসূত্র 

  1. Bray GA. Medical consequences of obesity. The Journal of clinical endocrinology & metabolism. 2004 Jun 1;89(6):2583-9.
  2. Brewer CJ, Balen AH. Focus on obesity. Reproduction. 2010;140(3):347-64.
  3. Srivastava G, Fox CK, Kelly AS, Jastreboff AM, Browne AF, Browne NT, Pratt JS, Bolling C, Michalsky MP, Cook S, Lenders CM. Clinical considerations regarding the use of obesity pharmacotherapy in adolescents with obesity. Obesity. 2019 Feb;27(2):190-204.

আমি মোঃ মাহমুদ হোসেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত আছি। আমার স্থায়ী বাসস্থান চাঁদপুর। তবে স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছে ঢাকায়। নিজের মনের চিন্তা ভাবনা গুলোকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্যই মূলত লেখালেখি করি। বিশ্বের নতুন কোন আবিষ্কার বা নতুন কোন জিনিস সম্পর্কে জানার আগ্রহ খুবই বেশি। সেই আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন বই, পত্রিকার সংখ্যা ও আরো অন্যান্য অনেক সূত্র হতে নিয়মিত পড়াশোনা করি। পড়াশোনার মাধ্যমে নিজের ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিধিকে বর্ধিত করার চেষ্টা করি। তার থেকে যা কিছু বুঝি তার সংক্ষেপে গুছিয়ে লিখার চেষ্টা করি। 

একটি প্রত্যুত্তর করুন

Your email address will not be published.