ডায়েট পিল — ওজন কমানোর ঔষধ কতটা কার্যকরী
/

ডায়েট পিল — ওজন কমানোর ঔষধ কতটা কার্যকরী

92 বার পড়া হয়েছে

যতই দিন আগাচ্ছে, মানুষ ততই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। আর এই প্রযুক্তি নির্ভরশীলতাই আমাদের কায়িক শ্রমকে কমিয়ে দিয়েছে। একটা সময় মানুষ হেঁটে অনেক দূরদুরান্তের পথ পাড়ি দিত, আর এখন কাছাকাছি জায়গাতেও আমরা রিক্সা বা গাড়ি ছাড়া যেতে পারি না। আগে যখন লিফট ছিল না সিড়ি বেয়ে আমরা উপরে উঠতাম, আর এখন লিফট ছাড়া যেন আমরা নিচতলা থেকে দোতলায় উঠতে পারি না। তাই দেখা যায় আগের দিনের মানুষরা যতটা শক্তিশালী বা কর্মঠ ছিলেন, সেই সাথে তাদের আয়ুও ছিল অনেক বেশি; কিন্তু বর্তমানে আমরা নানারকমের স্বাস্থ্যঝুকিতে পড়ে যাচ্ছি। 

স্থূলতা (Obesity) বা অতিরিক্ত ওজন বর্তমানের আলোচিত বিষয়ের মধ্যে একটি। কারণ স্থূলতা থেকেই ডায়াবেটিস, হার্ট, কিডনি বা লিভারের বিভিন্ন জটিল রোগ হবার অনেক সম্ভাবনা থাকে। তাই বর্তমান সময়ে এসে স্থূলতার বিষয়ে বিস্তারিত জানাটা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। তাই আজকে আমরা স্থূলতা, তা কমাতে কিছু ঔষধের আদ্যপান্ত এবং ঔষধ ছাড়া কিভাবে স্থূলতা কমানো যায় এই বিষয়ে জানবো।

স্থূলতা কি (What is Obesity)? 

বেশিরভাগ মানুষই মোটা হওয়াকে স্থূলতা বলে থাকে। কিন্তু স্থূলতা শুধুমাত্র শরীরের ওজনের উপর নির্ভর করে না। এটা একই সাথে ওজন ও উচ্চতা উভয়ের উপরই নির্ভর করে। একজন স্বাভাবিক মানুষ স্থূলতায় আছেন কিনা, তা কিন্তু খুব সহজেই বি এম আই (Body mass index – BMI) দ্বারা আমরা নির্নয় করতে পারি। সাধারণত BMI এর মান ২৫ এর কম হলে তাকে সুস্থ-স্বাভাবিক ধরা যায়। ২৫-২৯ এর মধ্যে হলে অতিরিক্ত ওজন এবং BMI এর মান ৩০ এর উপরে হলে তাকেই স্থূল ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। 

তবে এই BMI পদ্ধতি ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টদের কাছে অনেক জনপ্রিয় হলেও এর কিছু অসুবিধাও রয়েছে। প্রথমত, এটা অনুর্ধ-২০ বছর বয়স্কদের শারিরীক অবস্থা বর্ণনা করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, এর দ্বারা শরীরের মাংসপেশী বেশি আছে কি কম; তা নির্ধারন করতে পারা যায় না। তবে US Centers for Disease Control and Prevention বা CDC ২০ এর কম বয়সীদের স্থূলতা পরিমাপের জন্য percentile of BMI বা BMI এর শতকরা পরিমাপ হিসেব করে থাকে। তবে সর্বসাকুল্যে BMI এবং percentile of BMI-ই স্থূলতা নির্ধারনের একমাত্র মাধ্যম।

অনেকসময় দেখা যায় অনেকেরেই ওজন এবং উচ্চতা BMI রেঞ্জের মধ্যে আছে। কিন্তু তাদের পেটের চর্বি অস্বাভাবিকহারে বেড়ে যাচ্ছে; এক্ষেত্রে একে বলা হয় central obesity। সাধারণত পুরুষের কোমরের মাপ ৪০ ইঞ্চির বেশি এবং নারীদের কোমরের মাপ ৩৫ ইঞ্চির বেশি হলে তারাই এই ধরণের স্থূলতায় আক্রান্ত বলে ধরে নেয়া হয়। 

এপর্যন্ত পড়ে আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, স্থূলতা হলে তেমন একটা সমস্যা হয়তো হবে না, শুধু একটু ওজন বাড়বে, যা কয়দিন ব্যায়াম করলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি জেনে অবাক হবেন, স্থূলতা আপনার শরীরে অনেক ধরনের মারাত্মক রোগ থেকে শুরু করে আপনার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। আসুন স্থূলতা থেকে আর কি কি সমস্যা হতে পারে সে বিষয়ে জানি;

  • রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি (শরীরে ভালো ও খারাপ দুই ধরণের কোলেস্টেরল থাকে। স্থূলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে খারাপ কোলেস্টেরলগুলো মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে)
  • Obstructive sleep apnea (ঘুমের সময় স্বল্প সময়ের জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া)
  • হাড়ের জয়েন্টে সমস্যা হতে পারে
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিকের সমস্যা, বন্ধ্যাত্বতা বা জন্মের সময়ে বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি হতে পারে
  • এছাড়াও ডায়াবেটিস, বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার, ইনফেকশন ইত্যাদি স্থুলতার কারণে হতে পারে।

এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, স্থূলতা কতটা জটিল সমস্যা। বলা হয়ে থাকে যে, একজন তার ওজন ৪,৫-৬,৮ কেজি পর্যন্ত কমাতে পারলে তার ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তাচাপের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়। তাই ওজন কমিয়ে শরীর ফিট রাখতে পারলেই আপনি রোগমুক্ত থাকতে পারবেন।

স্থূলতা কারণঃ

খুব  সহজ করে বললে, আপনি খাবারের মাধ্যমে যে পরিমান ক্যালরি বা শক্তি গ্রহন করছেন, সে পরিমান শক্তি যদি কাজ করে খরচ করতে পারেন, তাহলে আপনার শরীর ফিট বা ঠিক থাকবে। কিন্তু কোনোকারণে এটার ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটলেই আপনি স্থূলতায় আক্রান্ত হতে পারেন। দেখা গেলো আপনি যতটুকু খাবার নিয়েছেন, সে পরিমান আপনার শক্তি ব্যয় করেছেন না, তখনই দিনের পর দিন আপনার চর্বির পরিমান বাড়তে থাকবে এবং আপনি স্থূল হয়ে যাবেন। 

তবে এছাড়াও জিনগত, পরিবেশগত বা কোনো চিকিৎসায় ব্যবহৃত কোনো ঔষধের কারণেও একজন ব্যক্তি স্থূল হতে পারেন। 

বাবা-মায়ের স্থূলতা থাকলে তা বাচ্চাদের মধ্যে হবার সম্ভাবনা থাকে, যাকে আমরা জিনগত কারণ হিসেবে বলতে পারি। আর যদি বলি পরিবেশগত কারণের কথা- বর্তমানে আমরা খুবই কম পরিশ্রমের কাজ করে থাকি। দেখা যায় যে, নিচতলা থেকে দোতলা উঠতেই আমরা লিফট ব্যবহার করি। হাঁটা দুরুত্বটাও আমরা রিক্সা বা গাড়ি দিয়ে যাচ্ছি। আগে বিকালে ছেলেরা মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল খেলত, এখন প্রযুক্তির বদৌলতে অনলাইন গেমস, সোস্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাচ্ছে; এসবের ফলে যে পরিমান ক্যালরি সে নিচ্ছে, তা ভাঙ্গতে পারছে না। ফলে সময়ের সাথে সাথে ওজন বেড়ে যাচ্ছে। 

ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইনসুলিন শরীরের ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। নারীদের ক্ষেত্রে বয়সন্ধির পরে স্থূল হতে দেখা যায়। এসময় তাদের শরীরে ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন হরমোন উৎপাদন শুরু হয়, যা ওজন বৃদ্ধি করতে পারে। থাইরয়েড হরমোনগুলো শরীরের মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। তাই হাইপোথাইরয়ডিজম, অর্থাৎ যাদের থাইরয়েড হরমোন কম আছে, তাদের স্থূলতার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এছাড়াও নিউরোপেপটাইড-Y, ঘ্রেলিং ইত্যাদি হরমোন ক্ষুধা বৃদ্ধির মাধ্যমে আপনাকে স্থূল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে কোলেসিস্টোকাইনিন, লেপ্টিন, পলিপেপটাইড-Y ইত্যাদি হরমোন ওজন কমাতে সাহায্য করে। 

ডায়েট পিল কিভাবে কাজ করে? 

মূলত শরীরে স্থূলতা বা ওজন বৃদ্ধির জন্য যেসব কারণ দায়ী, ডায়েট পিল তাদেরকে বন্ধ করে দেয় বা কাজ করতে দেয় না। ডায়েট পিলের কাজকে আমরা প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি;

  • খাবারের মাধ্যমে অর্জিত শক্তি বা ক্যালরি ভেঙ্গে ফেলা,
  • হজমের সময় যেসব ক্যালরি শোষিত হয়, তার সংখ্যা হ্রাস করা,
  • ক্ষুধা হ্রাস করা। 

খাবারের মাধ্যমে আসা ক্যালরি আমাদের শরীরের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। শরীরের শক্তির উৎস হিসেবে এসব ক্যালরি ব্যবহৃত হয়, যাকে থার্মোজেনেসিস (thermogenesis) বলে। শাব্দিক অর্থে থার্মোজেনেসিস মানে তাপ উৎপাদন করা। যখন ক্যালরি খরচ হয়, তখন শরীরে তাপ উৎপন্ন হয়। শরীরে যখন ক্যালরি খরচ হতে থাকে, তখন ওজন হ্রাস পায়। সাধারণত এই পদ্ধতিতে যেসব মেডিসিন দেয়া হয় তার মধ্যে নিচের এক বা একাধিক উপাদান আছে; ক্যাফেইন, ফিনাইল প্রোপানলঅ্যামাইড এবং এফেড্রিন। কিছু খারাপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার (হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক) কারণে আমেরিকার বাজার থেকে ফিনাইল প্রোপানলঅ্যামাইড এবং এফেড্রিন থাকা মেডিসিনগুলো এখন সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

আমরা যখন কোণো খাবার খাই, প্রথমে সেটা পাকস্থলীতে যায় এবং অন্ত্রের মাধ্যমে শোষিত হয়। যখন কেউ অনেক বেশি খায়, তখন অতিরিক্ত খাবারটি চর্বি হিসেবে শরীরে জমা হতে থাকে, যার ফলে সময়ের সাথে সাথে ওজন বৃদ্ধি হতে থাকে। কিছু মেডিসিন তথা ডায়েট পিল আছে, যারা ক্যালরিকে শোষিত হতে দেয় না এবং অতিরিক্ত ক্যালরি তার মলের সাথে বের করে দেয়। যেকারণে দেখা যায় ওই ব্যক্তিটি অনেক খাওয়া দাওয়া করলেও তার ওজন বৃদ্ধি ঘটে না। কিন্তু যেহেতু এই মেডিসিনগুলো খাবার তথা ক্যালরির শোষন বন্ধ করে, এরা একই সাথে খাওয়া অন্যান্য ঔষধেরও শোষন বন্ধ করে দিতে পারে। এছাড়াও যেহেতু এরা পরিপাকতন্ত্রে কাজ করে, তাই দেখা যায় ডায়রিয়া বা পেট ফাঁপা এমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। 

আমাদের সারা শরীরের কাজের নিয়ন্ত্রন করে মস্তিষ্ক। যখন পেট ভরা থাকে, তখন পাকস্থলী মস্তিস্কে সিগনাল পাঠায় যে, পেট বা পাকস্থলী ভর্তি হয়ে গেছে, এখন খাবার খাওয়া বন্ধ কর। কিছু নিউরোট্রান্সমিটার (নরএফিনেপ্রিন, সেরোটনিন, ডোপামিন) আছে যারা পাকস্থলী থেকে মস্তিস্কে সিগনাল পাঠায়। কিছু ডায়েট পিল এসব নিউরোট্রান্সমিটারকে বৃদ্ধি করে, যার ফলে সবসময় পেটে ভরা মনে হয় এবং ক্ষুধা কম লাগে। তবে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রন ছাড়াও এদের অন্যান্য কাজও রয়েছে। যেমন বলতে গেলে নরএফিনেপ্রিন রক্তচাপ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। তাই ক্ষুধা নিয়ন্ত্রন করতে এসব নিউরোট্রান্সমিটার বাড়াতে গেলে অনেক সময়ই হিতে বিপরীত হতে পারে। 

কারা ডায়েট পিল নিতে পারবেন?

ডায়েট পিল কিভাবে কাজ করে তা আমরা মাত্রই জানলাম। সাথে এও জানলাম এসব ঔষধে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। যেহেতু স্থূলতার সাথে অনেক রোগ জড়িত, তাই অনেকক্ষেত্রেই স্থূলতা কমানোর জন্য ঔষধের দরকার পড়ে। তবে কারা নিতে পারবেন এসব ডায়েট পিল?

  • যাদের BMI ৩০ এর বেশি
  • অথবা যাদের BMI ২৭ এর বেশি এবং সাথে উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল জনিত সমস্যা আছে
  • অথবা যাদের কোমরের মাপ পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪০ ইঞ্চি, নারীদের ক্ষেত্রে ৩৫ ইঞ্চি এবং সাথে উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল জনিত সমস্যা আছে তারাই ডাক্তারের পরামর্শে ডায়েট পিল নিতে পারবেন।

তবে এটা খেয়াল রাখতে হবে ডাক্তার যাকেই এসব মেডিসিন দিবেন, এসবের সাথে সাথে তাকে নিয়মিত ব্যায়াম বা কায়িক শ্রম করতে হবে। শুধুমাত্র ঔষধ খেয়ে আপনি লম্বা সময় ধরে ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারবেন না।

ওজন কমানোর জন্য FDA কর্তৃক অনুমোদিত ঔষধঃ

ওজন কমানোর জন্য FDA কিছু ঔষধের অনুমোদন দিয়ে থাকে। এরা মূলত দুই প্রকারঃ

  • এনোরেক্সেন্ট, যা মস্তিস্কের বিভিন্ন কেমিক্যালের উপর কাজ করে

সাধারণত Amphetamines গ্রুপের ঔষধগুলো এই গ্রুপের মধ্যে পড়ে। মূলত attention deficit hyperactivity disorder (ADHD) রোগের চিকিৎসায় এই জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা হয়। তবে মাঝেমধ্যে স্থূলতায়ও ডাক্তাররা এটি ব্যবহার করে থাকেন। এই ঔষধগুলো শর্ট-টার্ম ইফেক্ট বা অল্প সময়ের (১২ সপ্তাহ বা তার কম) জন্য ব্যবহার করা হয়। এই জাতীয় ঔষধগুলো কিভাবে ওজন কমাতে সাহায্য করে বিজ্ঞানীর এখনো এ ব্যাপারে নিশ্চিত না। তবে ধারণা করা হয়, এরা নরএফিনেপ্রিন, ডোপামিন এসব বৃদ্ধি করে, যা ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে। আবার ধারনা করা হয় যে, এরা ঘ্রান বা স্বাদের অনুভুতিকে কমিয়ে দেয়, যার ফলে খাবারের আগ্রহ কমে যায় এবং ওজন কমে যায়।

তবে এসব ঔষধ বেশ একটা ওজন কমাতে পারে না, ৩-৮% পর্যন্ত ওজন কমাতে পারে। তাই ডাক্তাররাও ওজন কমানোওর জন্য এটা তেমন একটা দিতে চান না। এছাড়াও দিলেও অল্প সময়ের জন্য দিয়ে থাকেন। এই ধরনের ঔষধের সবচে বড় সমস্যা হচ্ছে যে, রোগী দীর্ঘসময় এই ঔষধ নিলে এই ঔষধের প্রতি আসক্ত হয়ে যেতে পারে। ফলে তার বারবার এই ঔষধ খেতে মন চায়, হ্যালুসিনেশন হতে পারে। এছাড়াও আরও নানারকম জটিলতা তৈরি হতে পারে।   

এই এনোরেক্সেন্ট গ্রুপের আরেকটা ঔষধ হচ্ছে সিবুট্রামাইন (SIBUTRAMINE)। সাধারণত লম্বা সময় চিকিৎসার জন্য এটা ব্যবহার করা হয়। এটা মুলত একটা নরএড্রেনার্জিক ও সেরোটোনার্জিক এজেন্ট, যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রনের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোয় কাজ করে এবং খাবার ভাঙ্গার হার বৃদ্ধি করে। বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে, এই ঔষধগুলো ৮-৯ কেজি বা তার বেশি ওজন পর্যন্ত কমাতে পারে। 

এক গবেষনায় দেখা গেছে, টানা দুইবছর এই ঔষধ খাওয়ার পরে বেশিরভাগ রোগীরই ওজন কমেছে এবং রক্তে চর্বির পরিমানও অনেক কম। তবে যেহেতু এটি একটি প্রেসক্রিপশন ড্রাগ এবং এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এই ঔষধ খাওয়া কোনমতেই উচিত না।  

  • লাইপেজ ইনহিবিটর, যারা রক্তে চর্বি জাতীয় বস্তু শোষিত হতে দেয় না

এই গ্রুপের ঔষধের নাম হচ্ছে অরলিস্ট্যাট (ORLISTAT)। ক্লিনিকাল স্টাডিতে দেখা যায়, কম ডোজে এই ঔষধ যতটূকু ওজন কমায়, তার চেয়ে বেশি ডোজে তার চেয়ে বেশি ওজন কমায়। তবে এরা যেহেতু রক্তে চর্বির শোষন কমাতে সাহায্য করে, অনেকক্ষেত্রেই এরা খাবারে বিদ্যমান থাকা ভিটামিন শোষনও বন্ধ করে দেয়। তাই এই ঔষধের সাথে প্রতিদিন একটা করে মাল্টিভিটামিন ঔষধ নেয়া বাঞ্চনীয়। 

এক গবেষনায় দেখা যায়, ডায়াবেটিস ও স্থূলতায় আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে এটা খুবই ভালো কাজ করে; ওজনও কমায় আবার রক্তে গ্লূকোজের মাত্রাও নিয়ন্ত্রনে রাখে। অন্য একটি গবেষনায় দেখা যায় যে, স্থুলতার কারণে যাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকে, তারা তাদের ক্ষেত্রেও ওজন কমার সাথে ডায়াবেটিসও হচ্ছে না। 

তবে যেহেতু মেডিসিনটি চর্বি শোষিত হতে দেয় না, তাই চর্বিগুলো মলের মাধ্যমে বের হতে গিয়ে নানারকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রোগীরা একটা সময় পর এই ঔষধ বন্ধ করে লো ফ্যাট বা কম চর্বিযুক্ত খাবার খেয়েই ওজন কমাতে চায়। 

ওজন কমানোর ঔষধ ব্যবহারে কিছু নীতিমালাঃ

যেহেতু ওজন কমানোর ঔষধগুলোয় কিছু খারাপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তাই ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (NIH) এসব ঔষধ কোন কোন রোগীকে দেয়া যাবে, তার একটা তালিকা করেছে;

  • ওজন কমাতে চাইলে শুরুতেই খাদ্যাভাস পরিবর্তন ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে
  • খাদ্যাভাস পরিবর্তনের পরও যদি প্রথম সপ্তাহে আধা কেজির মতো ওজন না কমে, তখন ঔষধ খাওয়া শুরু করতে হবে। 
  • যদি একমাস ঔষধ দিয়ে চিকিৎসার পরও ২ কেজির মতো ওজন না কমে, তাহলে ঔষধটি পরিবর্তন করতে হবে বা এর ডোজ বাড়াতে হবে। 

বর্তমানে ওজন কমানোর ঔষধগুলোর প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসব ঔষধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল খুবই অল্প পরিমানে হয়ে থাকে। এছাড়াও এসব ঔষধের অনেক খারাপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এসব ঔষধ ব্যবহার করতে অনুৎসাহিত করা হয়। নিজ থেকে ওজন কমাতে চাইলে ঔষধের উপর নয়, বরং নিয়মিত ব্যায়াম ও খাদ্যাভাস পরিবর্তন করতে জোর তাগিদ দেয়া হয়ে থাকে। 

ওজন কমানোর জন্য ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টঃ

প্রথমেই আসা যাক, ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট কি? Congress in the Dietary Supplement Health and Education Act (যা পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে আইন হয়) অনুযায়ী, ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট হচ্ছে;

  • কোনো কিছুর ঘাটতি হলে সাপ্লিমেন্টটা এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে
  • ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিনের উপাদান এক বা একাধিক থাকবে
  • ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, পিল বা তরল জাতীয় খাবার হতে হবে
  • এটি যে একটা ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট, তা এতে লেবেল করা থাকতে হবে।

বেশিরভাগ মানুষই এসব প্রকৃতিতে পাওয়া যায় দেখে ভেবে নেয় যে, এসব খাওয়া নিরাপদ। কিন্তু এসবেরও অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। হাজারেরও বেশি ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট বাজারে পাওয়া যায়। সব নিয়ে এই এক লেখায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। 

আমেরিকায় এফেড্রা (EPHEDRA) ওজন কমানো এবং এথলেটদের পারফর্মেন্স বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হত। কিন্তু এটি এম্ফিটামিনের মতোই কাজ করে। তবে মাত্র একটি ডোজেই রক্তচাপ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে হার্ট অ্যাট্যাক, স্ট্রোক, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। পরবর্তীতে এ কারণে জনপ্রিয় ঔষধটি মার্কেট থেকে সরিয়ে নেয়া হয়।

মার্কেট থেকে এফেড্রা সরিয়ে নেওয়ার পর ঔষধ কোম্পানী এফেড্রার পরিবর্তে ক্যাফেইন বা ক্যাফেইন জাতীয় পদার্থ মার্কেটে আনে, যা কম ডোজে ভালো ইফেক্ট দিচ্ছিল। মূলত হজম তথা মেটাবলিজম বৃদ্ধির মাধ্যমে এই জাতীয় ঔষধ ওজন কমাতে পারতো। কিন্তু ডোজ বৃদ্ধির সাথে সাথে নিদ্রাহীনতা, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, অনিয়মিত হার্টবিটের মতো সমস্যা দেখা যেতে পারে। 

হাইড্রক্সিসাইট্রিক এসিড যা Garcinia campogia উদ্ভিদে পাওয়া যায়। ল্যাবে বিভিন্ন প্রানীর উপর করা টেস্টে দেখা যায়, এটা শরীরের খাবারের সাথে আসা ক্যালরিকে চর্বিতে রুপান্তর হতে দেয় না এবং এভাবে শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। তবে মানুষের মধ্যে কেমন ইফেক্ট দিবে এ ব্যাপারে এখনও তেমন কিছু জানা যায় না। এই উদ্ভিদের কোলেস্টেরল কমানোর ব্যাপারেও পর্যাপ্ত ধারণা পাওয়া যায়। 

ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টটাও কেউ গ্রহন করতে চাইলে আগে পর্যাপ্ত রিসোর্স থেকে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা, খেলে কোনো ধরণের শারিরীক সমস্যা হতে পারে কিনা, এসব বিষয়ে খেয়াল করে নেয়া উচিত।

ডায়েট পিলের অপব্যবহারঃ

খাবারের সাথে সম্পর্কিত অনেকগুলো রোগের মধ্যে আমরা এখানে ২টি রোগ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব। 

  • এনোরেক্সিয়া (ANOREXIA)

ওজন বৃদ্ধির ভয়ে বা চিন্তায় খাবার না খাওয়াকে সাধারণত এনোরেক্সিয়া বলা হয়। সাধারণত বর্তমানের তরুণ মেয়েদের মধ্যে এর প্রচলন খুব বেশি। জিরো ফিগার ধরে নিজেকে আকর্ষনীয় করার জন্য দিনের পর দিন তারা না খেয়ে থেকে খাবারের অনিয়ম করে। কিছু লক্ষন দেখলে খুব সহজেই বুঝা যায় একজন মানুষ এনোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত কিনা। যেমনঃ

  • অনেক বেশি ওজন কমে যাওয়া
  • সবসময় নিজের ওজন নিয়ে চিন্তিত থাকা এবং এসব নিয়েই কথা বলা
  • প্লেটে অনেক খাবার থাকা সত্তেও খেতে না চাওয়া
  • ওজন কমানোর জন্য টানা ডায়েট পিল খাওয়া বা অতিরিক্ত ব্যায়াম করা 

এনোরেক্সিয়ার রোগীর ক্ষেত্রে অনেকসময় খারাপ কিছু ইফেক্ট দেখা যেতে পারে। যেমন; চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, ঠিকমতো চিন্তা করতে না পারা, রক্তশূন্যতা বা মেয়েদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত পিরিয়ড হবার ঝুঁকি থাকে।

  • বুলিমিয়া (BULIMIA)

অনেক খাবার খেয়ে খুব দ্রুত বমি করে দেয়া যাতে ওজন বাড়তে না পারে, একেই বুলিমিয়া বলা হয়। মূলত যারা না খেয়ে থাকতে পারে না, আবার ওজনও কমাতে চায়, তারাই মূলত এই কাজ করে থাকে। সাধারণত বুলিমিয়ার লক্ষনও এনোরেক্সিয়ার মতোই।  

ওজন কমানোর স্বাস্থ্যকর উপায়ঃ 

যেহেতু ডায়েট পিলের অনেক স্বাস্থ্যঝুকি রয়েছে, তাই স্বাস্থকর উপায়ে ওজন কমানোর কিছু উপায় বলে দিতে চাই। মূলত খাদ্যাভাস পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম করার এবং পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের মানসিক সাপোর্টের মাধ্যমে একজ ব্যক্তি তার ওজন কমানোর চেষ্টা করতে পারে। 

  • খাদ্যতালিকাগত পরিবর্তনঃ প্রথমত খাবারে ক্যালরি কমাতে হবে বা কম ক্যালরিযুক্ত খাবার খেতে হবে। বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার যত পারা যায় এড়িয়ে চলতে হবে। অতি কম খাবার খাওয়া যাবে না, সেক্ষেত্রে শরীর খারাপ হতে পারে। এমনকি কেউ যদি চকোলেট, চিপস এসব খাবার অনেক বেশি খায়, তাহলে প্রথমেই এসবের কম  ক্যালরি ভার্সন খেত্তে হবে এবং অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ক্যালরি কম না খেলে ওজন কমবে না।
  • শারিরীক ক্রিয়াঃ প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম করলে শরীর ফিট থাকে এবং ওজন কমে। এছাড়াও ব্যায়াম হার্টের রোগ, ডায়াবেটিসের এসবের জন্য অনেক উপকারী। কিন্তু অতি স্থুল যারা তাদের জন্য ব্যায়াম করাটা কিছু কষ্টকর হয়ে যাবে। তাই তারা অল্প করে শুরু করতে পারেন এবং পরে ডাক্তারের পরামর্শে এটা বাড়াতে পারেন। কিছু ব্যায়ামের কথা বলা যেতে পারে। প্রতিদিন মাইলখানেক হাঁটা, বাগান করা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, ফুটবল বা ভলিবিল খেলা ইত্যাদির মাধ্যমে শারিরীক ব্যায়াম করা যেতে পারে। 

সবশেষে বলা যায়, শুরুর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে ব্যায়ামের মাধ্যমে সপ্তাহে ৪৫০ ক্যালরি খরচ করা যায়, এরপর তা বাড়তে বাড়তে ১০০০ ক্যালরি পর্যন্ত হবে। National Institutes of Health ব্যায়ামের জন্য কিছু নির্দেশনা দিয়েছে;

  • প্রাথমিক অবস্থায় ব্যায়ামগুলো হবে খুবই অল্প
  • হালকা ব্যায়াম, যেমন, আস্তে আস্তে হাঁটা, ঘরদোর পরিস্কার করা
  • মাধ্যমিক লেভেলের ব্যায়াম, যেমন; ১৫ মিনিটের এক মাইল হাঁটা, সাইক্লিং, ডান্সিং করা
  • উচ্চ লেভেলের ব্য্যায়াম, ১০ মিনিট জগিং করা বা বাস্কেটবল বা ফুটবল খেলা।
  • মানসিক সাপোর্টঃ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূল ব্যক্তি যারা, তাদেরকে আমরা সমাজের মানুষ কেনো যেনো স্বাভাবিকভাবে নিতে পারিনা। আমরা তাদেরকে নানাভাবে হেয় করে থাকি। এসব কারণে দেখা যায় তারা খাদ্যতালিকা পরিবর্তন বা ব্যায়াম করতে গেলেও অনেকের হাসির খোরাক হতে হয়। তাই এসব বাদ দিয়ে একজন অস্বাভাবিক ওজনের ব্যক্তিকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দিতে হবে। ডাক্তার ও আশেপাশের বন্ধুবান্ধবদের সাপোর্টে সে একটা সময় ঠিক হয়ে যাবে আশা করা যায়। 
  • সার্জারীঃ ওজন কমানোর জন্য সার্জারী বা অপারেশন করা খুবই বিপদজনক এমনকি এতে রোগীর ফুসফুস বা পায়ে রক্ত জমাট বেধে যেতে পারে এবং ইনফেকশানও হতে পারে। কখনোই রোগীকে এই ধরণের সার্জারী করতে বলা হয় না, যতক্ষন না ডাক্তার রোগীর ওজনকে বিপদজনক মনে না করেন।

এখানে রোগীর পাকস্থলীতে খাবার প্রবেশের পথকে ছোট করে দেয়া হয়, যাতে অল্প খাবার প্রবেশ করতে পারে। তবে এ ধরণের সার্জারীকে একেবারে শেষ আশা হিসেবে ধরা হয়। আর যাদের BMI ৪০ (চল্লিশ) এর বেশি, তারাই অবস্থাভেদে এই ধরনের সারজারীর জন্য মনোনিত হন। 

পরিশেষে বলা যায়, শারিরীক ওজন নিয়ে কখনো আক্ষেপ বা অনুশোষন করা ঠিক নয়। এটাকে নিয়েই স্বাভাবিকভাবে চলার চেষ্টা করতে হবে। ডায়েট পিলের দিকে না ঝুঁকে নিয়মিত ব্যায়াম করা, পুষ্টিকর ও কম ক্যালরি এবং চর্বি ছাড়া খাবার খেলেই একটা সময় শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রনে চলে আসবে। 

আমি ইমতিয়াজ আহমদ, বর্তমানে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আছি। এছাড়াও আমি মলিকুলার বায়োলজি ও ফার্মাকোলজি ল্যাবে রিসার্চ করেছি এবং অনলাইনে টুকটাক লেখালেখির কাজ করি। অবসর সময়ে ঐতিহাসিক বই পড়া আমার শখ।

একটি প্রত্যুত্তর করুন

Your email address will not be published.