Dengue Fever Explained in Bangla
/

ডেঙ্গু জ্বর – লক্ষণ, সঠিক নির্ণয়, চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন

213 বার পড়া হয়েছে

ডেঙ্গু জ্বর একটি এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত রোগ। এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের তিন থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সচরাচর ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলো দেখা দেয়। উপসর্গগুলির মাঝে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, পেশিতে ও গাঁটে ব্যথা এবং শরীরের চামড়ায় ফুসকুড়ি। ডেঙ্গু জ্বরের মারাত্মক রূপ, যাকে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারও (hemorrhagic fever) বলা হয়; এতে গুরুতর রক্তপাত, রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া (শক) এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর - লক্ষণ, সঠিক নির্ণয়, চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন

 চিত্রঃ ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্যে দায়ী এডিস মশা (Aedes aegypti)

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু

প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটে। মূলত বিশ্বের গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।। তবে ডেঙ্গু জ্বর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, ল্যাটিন আমেরিকা এবং আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বর্তমানে এই রোগটি ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশে স্থানীয় প্রাদুর্ভাব সহ নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু

বাংলাদেশ ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য আবহাওয়াগত ভাবে উপযোগী। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশের একটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা, দৈনিক প্রথম আলোর ৮ নভেম্বর, ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে,  দেশের ইতিহাসে এ বছরে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু বাংলাদেশে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ২০০০ সালের পর থেকে প্রতিবছর বহু মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন।

করোনা মহামারি শুরুর বছর ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কম ছিল। কিন্তু গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৮ হাজার ৪২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়। করোনা মহামারি শুরুর আগে ২০১৯ সালে ১ লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ওই বছর সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে মারা যান ১৭৯ জন। এত দিন এটাই ছিল এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।

২০২২ এর নভেম্বরের প্রথম ৮ দিনে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৭৮ জন এবং এই সময়ে মারা গেছেন ৪১ জন। গত অক্টোবর মাসে দেশে ২১ হাজার ৯৩২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মারা যান ৮৬ জন। সব মিলিয়ে গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত (৮ নভেম্বর) দেশে ৪৪ হাজার ৮০২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ৪১ হাজার ৩৯৭ রোগী। ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায়। আসন্ন ডেঙ্গু সংকটের হুমকি মোকাবেলায় আমাদের এখনই প্রস্তুত হতে হবে।

চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ৭৫ হাজার ৬৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৮ হাজার ৮১৪ জন এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৬ হাজার ২৫৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৫ হাজার ২৯০ জন। ঢাকায় ৩৪ হাজার ১১৭ এবং ঢাকার বাইরে ৩১ হাজার ১৭৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

দৈনিক সমকাল ৯ আগস্ট ২০২৩

ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ

ডেঙ্গুর হালকা উপসর্গগুলি অন্যান্য অসুস্থতার সাথে বিভ্রান্ত হতে পারে যা জ্বর, ব্যথা এবং ব্যথা বা ফুসকুড়ি সৃষ্টি করে। ডেঙ্গুর সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হল নিম্নোক্ত যেকোনো একটির সাথে জ্বর:

  • বমি বমি ভাব/ বমি হওয়া (২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৩ বার)
  • শরীরে চামড়ায় ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া
  • সাধারণ ব্যথাসহ অন্যান্য ব্যথা যেমন, চোখের ব্যথা, সাধারণত চোখের পিছনে, পেশী, জয়েন্ট বা হাড়ের ব্যথা
  • দাঁতের মাড়ি ফুলে যাওয়া এবং রক্ত আসা
  • মলের মধ্যে রক্ত আসতে পারে
  • ক্লান্তি, অস্থিরতা বা খিটখিটে বোধ করা ইত্যাদি।

ডেঙ্গুর লক্ষণ সাধারণত 2-7 দিন স্থায়ী হয়। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় জ্বর দেখা দিলেই ডেঙ্গু টেস্ট করতে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। বেশিরভাগ লোক প্রায় এক সপ্তাহ পরে সুস্থ হয়ে উঠবে।

জ্বর, সর্দিকাশি, শরীর ব্যথা, রুচি নেই, গলা ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি—এ ধরনের লক্ষণ থাকলে কোনো অবহেলা না করে অবশ্যই ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। ডেঙ্গু যদি না-ও হয়, তবু পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো।

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ – প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রথম পাতায় ০৪ আগস্ট ২০২৩ প্রকাশিত

ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় – কোন টেস্ট করতে হবে?

ডেঙ্গু জ্বর একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যা সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব যদি আপনার এলাকায় না থাকে তাহলে আপনার ডাক্তার আপনার চিকিৎসা এবং ভ্রমণের ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। চিকিৎসকের সাহায্য ব্যতীত ডেঙ্গু জ্বর নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে কারণ এর লক্ষণ এবং উপসর্গগুলি অন্যান্য রোগগুলির সাথে সহজেই মিলে যায় – যেমন সাধারণ জ্বর, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস, ম্যালেরিয়া এবং টাইফয়েড জ্বর।

আপনার ডাক্তার ডেঙ্গু ভাইরাসগুলির একটিতে সংক্রমণের প্রমাণের জন্য ল্যাবে পরীক্ষা করার জন্য রক্তের নমুনা নিতে পারেন। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কি না তা শনাক্ত করা হয়। সাধারণত NS1 (Dengue Virus Antigen Detection) এবং CBC (Complete Blood Count) পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝা যায় রোগী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে কিনা এবং রক্তের প্লাটিলেটের বর্তমান অবস্থা। তবে নিজে সিধান্ত না নিয়ে একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে আপনার জন্যে প্রয়োজনীয় ডেঙ্গু নির্ণয়ের নির্দিষ্ট পরীক্ষা ও অন্যান্য রক্তের পরীক্ষাগুলো করিয়ে নিন এবং সেই মোতাবেক চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

ডেঙ্গু জ্বরে প্রথম দিন থেকে পরবর্তী ১০ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। কাজেই নিজে নিজে পরীক্ষা করালে বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। এ ব্যাপারে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে ঠিক কবে প্রথম জ্বর এসেছিল, মনে রাখুন। জ্বরের একেবারে প্রথম দিন থেকেই ডেঙ্গু এনএস১ অ্যান্টিজেন পজিটিভ হওয়ার কথা। তবে চতুর্থ বা পঞ্চম দিন থেকে এটি আবার নেগেটিভ হয়ে যায়। তাই যদি জ্বর চার-পাঁচ দিনের বেশি হয়ে যায়, তাহলে আর এই পরীক্ষা করে লাভ নেই। সে ক্ষেত্রে ডেঙ্গু আইজিএম অ্যান্টিবডি টেস্ট করা যায়। এ সময় এটি পজিটিভ আসবে। আবার ৯-১০ দিনের মাথায় এটিও নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। তখন আইজিজি অ্যান্টিবডি পজিটিভ দেখায়। এই বিষয়গুলো জটিল, তাই কখন কোনটা করতে হবে, সে সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের ওপর ছেড়ে দিন।

ডা. আ ফ ম হেলালউদ্দিন, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। দৈনিক প্রথম আলো ২৩ আগস্ট ২০২৯ এ প্রকাশিত

ডেঙ্গুর চিকিৎসা 

ডেঙ্গু জ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ডেঙ্গু হলে কী ধরনের চিকিৎসা নেবেন, বাসায় না হাসপাতালে থাকবেন—নির্ভর করে এর ধরন বা ক্যাটাগরির ওপর। ডেঙ্গু জ্বরের তিনটি ধরন বা ক্যাটাগরি আছে—‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’। প্রথম ক্যাটাগরির রোগীরা স্বাভাবিক থাকে। তাদের শুধু জ্বর থাকে। অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী ‘এ’ ক্যাটাগরির। তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বাড়িতে বিশ্রাম নেওয়াই যথেষ্ট।

তবে বাড়িতে থেকে নিম্নলিখিত বিষয় গুলো মাথায় রেখে চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে।

  • পরিপূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে।
  • প্রচুর তরলজাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন পান করুন একটু পরপর।
  • ডেঙ্গু জ্বর হলে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। স্বাভাবিক ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন সর্বোচ্চ আটটি প্যারাসিটামল খেতে পারবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির যদি লিভার, হার্ট এবং কিডনি–সংক্রান্ত জটিলতা থাকে, তাহলে প্যারাসিটামল সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে গায়ে ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিন, ক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন–জাতীয় ওষুধ খাওয়া যাবে না। ডেঙ্গুর সময় এ–জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করলে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

‘বি’ ক্যাটাগরির ডেঙ্গু রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগতে পারে। কিছু লক্ষণ, যেমন পেটে ব্যথা, বমি, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, অন্তঃসত্ত্বা, জন্মগত সমস্যা, কিডনি বা লিভারের সমস্যা থাকলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াই ভালো।

‘সি’ ক্যাটাগরির ডেঙ্গু জ্বর সবচেয়ে খারাপ। এতে লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউর প্রয়োজন হতে পারে।

ডেঙ্গুর জন্য ব্যবহৃত সাধারণ ঔষধ

ডেঙ্গুর জন্য কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ  নেই। রোগীদের ভালভাবে হাইড্রেটেড থাকার পরামর্শ দেওয়া উচিত এবং অ্যাসপিরিন (অ্যাসিটিসালিসিলিক অ্যাসিড), অ্যাসপিরিনযুক্ত ওষুধ এবং অন্যান্য ননস্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ (যেমন আইবুপ্রোফেন) তাদের অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট বৈশিষ্ট্যের কারণে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে শরীরের তাপমাত্রা ও ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। এছাড়াও সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট হিসেবে মাল্টি-ভিটামিন, ভিটামিন-সি দেওয়া হয়ে থাকে।

এখন আমরা ডেঙ্গুর  ফার্স্ট লাইন এবং সেকেন্ড লাইন ট্রিটমেন্টে ব্যবহারিত ঔষধ সমূহের কর্ম প্রক্রিয়া,ব্যবহারবিধি এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানবো।

যেহেতু ডেঙ্গু জ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই তাই রোগীদের বিশ্রাম, হাইড্রেটেড থাকা এবং বাড়িতে থেকে প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ নেওয়াকেই ফার্স্ট লাইন ট্রিটমেন্ট হিসেবে ধরা হয়। তবে রুগীর প্লাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নামলে বা শরীরের কোনো জায়গা থেকে রক্তপাত হলে প্রয়োজন বোধে প্লাটিলেট বা ফ্রেশ রক্ত দেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি খুবই কম দেখা যায়।

প্যারাসিটামল কিভাবে কাজ করে (Mechanism of action of Paracetamol) 

প্যারাসিটামল একটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ব্যথানাশক যা হালকা থেকে মাঝারি ব্যথা উপশম করতে এবং প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু, উভয়ের জ্বর কমাতে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি প্রদাহ কমায় না। ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এর ব্যাপক ব্যবহার সত্ত্বেও, আমরা এখনও ব্যথা এবং জ্বর উপশমে প্যারাসিটামলের সঠিক প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। প্যারাসিটামল মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের উৎপাদন হ্রাস করে ব্যথা উপশম করে বলে মনে করা হয়। প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনগুলি আঘাত এবং নির্দিষ্ট রোগের প্রতিক্রিয়া হিসাবে শরীর দ্বারা উৎপাদিত হয়। তাদের ক্রিয়াগুলির মধ্যে একটি হল স্নায়ুর প্রান্তগুলিকে সংবেদনশীল করা, যাতে যখন সেই অঞ্চলটি উদ্দীপিত হয় তখন এটি ব্যথার কারণ হয়। 

প্যারাসিটামল মস্তিষ্কের এমন একটি অংশকে প্রভাবিত করে জ্বর কমায় যা আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে (হাইপোথ্যালামিক তাপ-নিয়ন্ত্রক কেন্দ্র)। প্যারাসিটামল হালকা থেকে মাঝারি ব্যথা উপশম করতে এবং জ্বর কমাতে অ্যাসপিরিন এবং আইবুপ্রোফেনের মতোই কার্যকর, কিন্তু এর বিপরীতে এটি প্রদাহ কমায় না। 

প্যারাসিটামল তরল এবং দ্রবণীয় ট্যাবলেটগুলো দ্রুত শরীরে শোষিত হয় এবং তাই অন্যান্য প্যারাসিটামল ডোজ ফর্ম যেমন ট্যাবলেটগুলোর তুলনায় দ্রুত কাজ শুরু করে।

প্যারাসিটামল ব্যবহারবিধি 

সাধারণত ভরাপেটে প্যারাসিটামল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে খালিপেটেও প্যারাসিটামল সেবন করা নিরাপদ। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি ডোজে সাধারণত ৫০০ মিলিগ্রামের (mg) একটি অথবা দুটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এভাবে সারাদিনে (২৪ ঘণ্টায়) চারবার পর্যন্ত প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। এক ডোজ প্যারাসিটামল সেবনের পরে কমপক্ষে চার ঘণ্টা বিরতি দিয়ে পরবর্তী ডোজটি সেবন করা যাবে।

শিশুদের ক্ষেত্রে তার বয়স অনুযায়ী নির্দিষ্ট ডোজের ঔষধ খাওয়াতে হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কম ডোজের ঔষধ প্রয়োজন হয়। সাধারণত ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সিরাপ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। শিশুর বয়স ৬ বছরের বেশি হলেও যদি ট্যাবলেট গিলতে অসুবিধা হয় সেক্ষেত্রে সিরাপ খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

সঠিক ডোজে প্যারাসিটামল সেবন করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবার সম্ভাবনা খুবই বিরল। বিশেষ কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে অথবা অস্বাভাবিক কিছু খেয়াল করলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

মারাত্মক অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন

বিরল কিছু ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল সেবনের ফলে মারাত্মক অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন হতে পারে।

নিচের ৫টি লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দেওয়ার সাথে সাথে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে—

  • চামড়ায় চুলকানিসহ লাল লাল ফুসকুঁড়ি বা র‍্যাশ দেখা দিলে
  • চামড়া ফুলে উঠলে অথবা ফোস্কা পড়লে কিংবা শরীরের কিছু জায়গা থেকে চামড়া উঠে আসার মতো অবস্থা হলে
  • হাঁপানি রোগীদের মত শোঁ শোঁ শব্দ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হলে
  • বুক অথবা গলা আঁটসাঁট হয়ে বা আটকে আসছে এমন অনুভব করলে
  • কথা বলতে অথবা শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে সমস্যা হলে
  • মুখ, ঠোঁট, জিহ্বা অথবা গলা ফুলে যেতে শুরু করলে

অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ঔষধের সাথে থাকা নির্দেশিকা পড়ুন।

ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কিত ১০ টি সাধারণ প্রশ্ন ও তার উত্তর

১. ডেঙ্গু জ্বর কি?

ডেঙ্গু জ্বর হল ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত মশা দ্বারা সৃষ্ট একটি রোগ এবং এটি বিশ্বের গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে প্রচলিত। এটি একটি বেদনাদায়ক, অক্ষমকারী রোগ, যার ব্যথার তীব্রতা হাড় ভাঙ্গার মতো – তাই এটি ‘ব্রেকবোন’ জ্বর নামেও পরিচিত। ডেঙ্গু জ্বর প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় 400 মিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করে, বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় 40% এক্সপোজার এবং সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। যেহেতু ডেঙ্গু জ্বর ভাইরাসের কারণে হয়, তাই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে নিরাময় করা যায় না ।

 ২. ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ কি?

ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে আকস্মিক উচ্চ জ্বর (40 ডিগ্রি সেলসিয়াস বা 104 ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত), ঠাণ্ডা লাগা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা (সাধারণত চোখের পিছনে), পেশী ব্যথা এবং জয়েন্টে ব্যথা , বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, ত্বকের ফুসকুড়ি এবং কিছু ক্ষেত্রে , হামের মতো ত্বকের ফুসকুড়ি। ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলি প্রাথমিকভাবে হালকা হতে পারে এবং ফ্লু, ঠান্ডা বা ভাইরাল সংক্রমণ বলে ভুল হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে, ডেঙ্গু জ্বর ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর নামে পরিচিত আরও প্রাণঘাতী আকারে বিকশিত হতে পারে , যার ফলস্বরূপ রক্তপাত, রক্তের প্লেটলেট সংখ্যা হ্রাস বা থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া, রক্তের প্লাজমা ফুটো বা আরও মারাত্মক ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম, যা বিপজ্জনকভাবে নিম্ন রক্তচাপ সৃষ্টি করে । 

৩. কিভাবে ডেঙ্গু জ্বর হয় এবং ছড়ায়?

ডেঙ্গু জ্বর এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশার কামড়ে মানুষ থেকে মশা থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু ভাইরাসটি ফ্ল্যাভিভাইরাস নামে পরিচিত একটি গ্রুপের অন্তর্গত এবং সাধারণত চারটি ভাইরাল সেরোটাইপ, DEN-1, DEN-2, DEN-3 এবং DEN-4 এ বিভক্ত করা যেতে পারে, যা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত কিন্তু তাদের অ্যান্টিজেনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এডিস প্রজাতির অনেক প্রজাতির মশা ডেঙ্গু ছড়ায়; বিশেষ করে, এডিস ইজিপ্টি প্রজাতিটি সাধারণত এর সাথে যুক্ত এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রধান কারণ। এই প্রজাতির মশা স্থির জলে জন্মায় এবং সাধারণত দিনের আলোতে কামড়ায়। একজন ব্যক্তির সংক্রমিত হওয়ার 2-7 দিন পর এই ভাইরাসটি রক্তে সঞ্চালিত হয়, এই সময়ে একটি মশা কামড়ায় ব্যক্তি এটি অর্জন করবে এবং পালাক্রমে কামড় দেবে এবং অন্য ব্যক্তিকে সংক্রামিত করবে।

লক্ষণগুলি সাধারণত 3 থেকে 14 দিনের মধ্যে যে কোনও জায়গায় বিকাশ লাভ করে, তবে সাধারণত সংক্রমণের 4 থেকে 7 দিনের মধ্যে শুরু হয় এবং 7 বা 10 দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশার উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না এবং মশা সারাজীবন সংক্রমিত থাকে। ডেঙ্গু রোগ ছড়ায় যখন একটি মশা আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ায় এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হয়ে ওঠে। মশাটি তখন অন্য একজন সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ায় এবং এইভাবে রোগটি ছড়িয়ে দেয় যা সম্ভাব্য মহামারী ব্রেকআউট সৃষ্টি করে। চারটির মধ্যে একটি একক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস সেরোটাইপে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যাইহোক, তারা অন্য তিনটি সেরোটাইপ দ্বারা সংক্রমণের জন্য অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

৪. ডেঙ্গু জ্বরের জটিলতা কি কি?

ডেঙ্গু জ্বর কখনও কখনও ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের মতো আরও বিপজ্জনক আকারে বিকশিত হতে পারে, যা জীবন-হুমকির লক্ষণগুলির বিকাশের দিকে নিয়ে যেতে পারে। রোগের কারণে সৃষ্ট কিছু জটিলতার মধ্যে রয়েছে:

  • মারাত্মক ডিহাইড্রেশন/ পানি শুন্যতা
  • অবিরাম রক্তক্ষরণ
  • কম প্লেটলেট , যার কারণে রক্ত ​​জমাট বাঁধে না
  • রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কম যেতে পারে
  • ব্র্যাডিকার্ডিয়া (হার্ট স্পন্দন প্রতি মিনিটে 60 কাউন্টের কম)
  • রক্তপাত, খিঁচুনি বা এনসেফালাইটিসের কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি
  • ইমিউন সিস্টেমের ক্ষতি
  • লিভার এবং যকৃতের ক্ষতি বৃদ্ধি

৫. আপনি কিভাবে ডেঙ্গু জ্বর নির্ণয় করবেন?

হঠাৎ উচ্চ জ্বরের সাথে শরীর, পেশী বা জয়েন্টে তীব্র ব্যথা হলে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় করা হয়। গ্রীষ্মমন্ডলীয় বা উপ-গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে থাকার দুই সপ্তাহের মধ্যে যখন একজন ব্যক্তির জ্বর হয় তখন এটি মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও আপনার এলাকায় বা আশেপাশে প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে আপনার ও ডেঙ্গু জ্বর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ডেঙ্গু প্রায়শই অন্যান্য রোগের মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে যেমন ফ্লু, হাম এবং টাইফয়েড জ্বর ইত্যাদি। তাই অন্যান্য রোগের অবস্থা বাদ দেওয়ার জন্য সবসময় তদন্ত করা হয়। সাধারণত, রোগীর রক্তে অ্যান্টিবডি এবং ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে ডেঙ্গু সংক্রমণ নির্ণয় করা যেতে পারে:

  • উপসর্গ দেখা দেওয়ার 5 দিনের মধ্যে রোগীদের কাছ থেকে সিরাম নমুনা সংগ্রহ করে ভাইরাসটিকে আলাদা করা।
  • উপসর্গ শুরু হওয়ার 6 দিনের মধ্যে সিরাম সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি সনাক্ত করা যেতে পারে। এনজাইম-লিঙ্কড ইমিউনোসরবেন্ট অ্যাসে ( ELISA ) দ্বারা নির্দিষ্ট অ্যান্টি-ডেঙ্গু অ্যান্টিবডিগুলির জন্য সিরাম পরীক্ষা করা হয়। আইজিএম এবং আইজিজি অ্যান্টিবডির টাইটার সিরাম নমুনায় চারগুণ বৃদ্ধি পায়।
  • রোগীর কাছ থেকে সংগৃহীত সিরাম বা সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) নমুনা থেকে ভাইরাল জিনোমিক সিকোয়েন্স সনাক্ত করার জন্য পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (PCR) ব্যবহার করা, যা আরও ব্যয়বহুল এবং জটিল।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরের মতো আরও গুরুতর জটিলতার ক্ষেত্রে, নিম্নলিখিত রোগ নির্ণয় করা আবশ্যক:

  • একটি টর্নিকেট পরীক্ষা করানো হয়, যেখানে একটি টর্নিকেট বাহুতে বাঁধা থাকে এবং যদি টর্নিকেটের বাইরে রক্তের দাগ দেখা যায়, তবে রোগীর রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে, যা ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর নির্দেশ করতে পারে।
  • প্লেটলেটের সংখ্যা (Platelets Count) হ্রাস, যা থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া (thrombocytopenia) নামেও পরিচিত, যখন প্লেটলেট সংখ্যা 100,000 এর নিচে নেমে আসে তখন ঘটে। সাধারণ প্লেটলেটের সংখ্যা 150,000 থেকে 400,000 এর মধ্যে। ডেঙ্গু জ্বরের কারণে প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যেতে পারে ।
  • হেমাটোক্রিটের বৃদ্ধি অর্থাৎ, লোহিত রক্তকণিকার (RBCs) আয়তনের শতকরা 20% বৃদ্ধি আরেকটি সূচক হতে পারে কারণ এটি রক্তরসের ভাস্কুলার ব্যাপ্তিযোগ্যতা বৃদ্ধির কারণে ঘটে। রক্তরস ফুটো হওয়ার লক্ষণগুলি যথাক্রমে প্লুরাল ইফিউশন বা অ্যাসাইটস নামে পরিচিত যা বুক এবং পেটের গহ্বরে তরল জমার বৃদ্ধি হিসাবে প্রদর্শিত হয়।

৬. আপনি কিভাবে ডেঙ্গু জ্বর চিকিৎসা করবেন?

যেহেতু রোগ নিরাময়ের জন্য কোনো পরিচিত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ইনজেকশন পাওয়া যায় না, তাই ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনায় প্রধানত প্রচুর সহায়ক পরিচর্যা জড়িত যা অবশেষে রোগীর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে। ডেঙ্গু জ্বর এবং তীব্র শরীর ব্যথা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। ডেঙ্গুর চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে প্যারাসিটামলের মতো অ্যান্টিপাইরেটিক ওষুধ দিয়ে জ্বর কমানো  এবং ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে শরীরের ব্যথা যা ব্যথা উপশম করতে সাহায্য করে। অ্যাসপিরিন এবং আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ এড়ানো উচিত কারণ তারা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রোগীর প্রাকৃতিক ঘরোয়া প্রতিকার যেমন পেঁপে পাতা, কিউই এবং অন্যান্য খাদ্য আইটেম দ্বারাও চিকিৎসা করা যেতে পারে যা প্লাটিলেটের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে যা ডেঙ্গুর সময় কম হয়ে যায়।

ডেঙ্গুর আরও গুরুতর রূপের ক্ষেত্রে, যেমন ডেঙ্গু হেমোরেজিক ডিজিজ বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম, রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এবং যথাযথ যত্ন দিতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর হার প্রায় 50 শতাংশ বেশি। শক প্রতিরোধ করার জন্য এই রোগীদের শিরায় তরল প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসা করা উচিত। রোগীদের প্রচুর পরিমাণে তরল পান করা উচিত, কারণ ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে ডিহাইড্রেশন সাধারণ।

৭. ডেঙ্গু ভ্যাকসিন কি আছে ?

সানোফি পাস্তুর দ্বারা তৈরি বিশ্বের প্রথম ডেঙ্গু ভ্যাকসিন (Dengue Vaccine) ডেঙ্গুভাক্সিয়া বা সিওয়াইডি-টিডিভি [Dengvaxia® (CYD-TDV), developed by Sanofi Pasteur] ডেঙ্গু মহামারী এলাকায় বসবাসকারী লোকেদের মারাত্মক মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের জন্য ডিসেম্বর 2015 সালে মেক্সিকো, ফিলিপাইন এবং ব্রাজিলে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়েছিল।

“ডেঙ্গু ভ্যাকসিন: WHO পজিশন পেপার – জুলাই 2016” অনুসারে, WHO বলে যে দেশগুলির সেই অঞ্চলে CYD-TDV প্রবর্তনের কথা বিবেচনা করা উচিত যেখানে মহামারী সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে যা ডেঙ্গুর উচ্চ প্রকোপ নির্দেশ করে৷

CYD-TDV আবিষ্কার ওষুধের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি চিহ্নিত করে। CYD-TDV হল একটি প্রফিল্যাকটিক ভাইরাল ভ্যাকসিন যা 9 থেকে 45 বছর বয়সের লোকেদের ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। এটি একটি ট্রিপল-ডোজ ভ্যাকসিন যা 0/6/12 মাসের সময়সূচীতে সাবকুটেনিয়াস রুটের মাধ্যমে দেওয়া হয়। এটিতে ডেঙ্গু ভাইরাসের 4টি সেরোটাইপ (1, 2, 3 এবং 4) রয়েছে।

CYD-TDV এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকায় পরিচালিত তার ফেজ 3 ট্রায়ালে গুরুতর ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদর্শন করেছে। যাইহোক, এর সামগ্রিক কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতা ছিল যা সেরোটাইপ, টিকা দেওয়ার সময় সেরোস্ট্যাটাস (ব্যক্তির আগে সংক্রমণ হয়েছে কিনা), অঞ্চল বা দেশ এবং বয়সের মতো ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস দ্বারা নতুন ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন TV003/TV005 তৈরি করা হয়েছে । তারা 4টি ডেঙ্গু ভাইরাস সেরোটাইপের সমস্ত অ্যান্টিবডি তৈরি করে। আগের ট্রায়ালগুলিতে, ভ্যাকসিনগুলির একটির একক ডোজ একটি শক্তিশালী অ্যান্টিবডি এবং সেলুলার ইমিউন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভ্যাকসিনটি কতটা কার্যকর তা পরীক্ষা করতে এবং এর নিরাপত্তা পরীক্ষা করার জন্য 2016 সালের জানুয়ারিতে সাও পাওলোতে TV003-এর একটি পর্যায় 3 ট্রায়াল শুরু হয়েছে। এর কার্যকারিতার প্রাথমিক ইঙ্গিত দুই বছরেরও কম সময়ে দেখা যেতে পারে।

টেট্রাভ্যালেন্ট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন (TDV) নামে তাদের দ্বারা তৈরি আরেকটি ভ্যাকসিনও ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ায় 2016 সালের প্রথম দিকে তার ফেজ 3 ট্রায়ালে প্রবেশ করেছে। এর ফেজ 1 এবং ফেজ 2 ট্রায়ালের ডেটা ইঙ্গিত দেয় যে এটি নিরাপদ, ভালভাবে সহনীয় এবং ইমিউনোজেনিক। পর্যায় 3 ট্রায়ালটি পরীক্ষা করবে যে ভ্যাকসিনটি তাদের সেরোস্ট্যাটাস নির্বিশেষে পৃথিবী জুড়ে উপসর্গযুক্ত ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের রক্ষা করে কিনা।

৮. কিভাবে আপনি ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধ করবেন?

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিরোধ করার জন্য কিছু মৌলিক পদক্ষেপ অনুসরণ করা সত্যিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। যেহেতু ডেঙ্গু হওয়ার একমাত্র উপায় হল মশার কামড়, তাই এটি প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হল মশা এড়ানো এবং মশার কামড় থেকে প্রতিরোধ করা। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যদি আপনার শহর বা শহরে ডেঙ্গু মহামারী চলছে। নিম্নে ডেঙ্গু প্রতিরোধের কিছু উপায় বর্ণনা করা হলো:

  • জমে থাকা পানিতে মশা বংশবিস্তার করে। তাই আশেপাশে এবং বাড়ির আশেপাশে, মাটিতে, ফুলের পাত্র, বালতি, ব্যারেল ইত্যাদিতে স্থির জল এবং পুল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। পানি সবসময় বন্ধ পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত। মেঝেতে জলের স্থির পুলগুলি মুছে ফেলা উচিত।
  • ব্লিচিং পাউডার জলের উৎসগুলিতে ব্যবহার করা যেতে পারে যা পান করার জন্য নয়, কারণ এটি মশার ডিমের বিকাশকে বাধা দেবে ।
  • প্রথমে মশার কামড় এড়িয়ে চলুন। ডিম উৎপাদনের জন্য মানুষের রক্তে উপস্থিত প্রোটিনের প্রয়োজন হয় বলে মশা আমাদের কামড়ায়। কামড়ানো রোধ করার জন্য, মশা তাড়ানোর জন্য মশা তাড়ানোর জন্য, মশা তাড়ানোর গাছগুলি ঘরে হোক বা বাইরে।
  • মশা এড়াতে, ভাল স্ক্রীন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ির ভিতরে বসবাস করা ভাল। যদি এটি সম্ভব না হয় তবে সমস্ত জানালায় মশারি লাগানো উচিত।
  • মশার কামড় প্রতিরোধ করার আরেকটি উপায় হল বাইরে সময় কাটানোর সময় লম্বা-হাতা শার্ট, প্যান্ট, মোজা এবং জুতা বা বুট পরা।
  • ভোরে, সন্ধ্যায় বা সন্ধ্যায় মশা বেশি সক্রিয় থাকে। তাই ডেঙ্গু বহনকারী মশা দ্বারা কামড়ানোর সম্ভাবনা কমাতে এই সময়ে বাইরে থাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
  • মশা গাঢ় রঙের পোশাকের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাই উজ্জ্বল এবং হালকা রঙের পোশাক পরা ভালো।
  • শক্তিশালী পারফিউম বা সুগন্ধি বডি লোশন এড়িয়ে চলুন, কারণ মশা তীব্র গন্ধে আকৃষ্ট হয়।

৯. ডেঙ্গু কি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রামক?

না, ডেঙ্গু ছোঁয়াচে নয় এবং শুধুমাত্র ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির সংস্পর্শে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। ডেঙ্গুর ভাইরাস মশা দ্বারা বাহিত ও ছড়ায়। যদি একটি মশা ডেঙ্গু আক্রান্ত কাউকে কামড়ায়, এবং তারপরে অন্য একজনকে কামড়ায়, তবে দ্বিতীয় ব্যক্তিটি সংক্রমিত হতে পারে। সাধারণত এভাবেই ডেঙ্গু ছড়ায় এবং কখনও কখনও মহামারীতে পরিণত হতে পারে।

১০. আমি কি একাধিক  বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারি?

হ্যাঁ, ডেঙ্গু চারটি ভিন্ন ভাইরাল স্ট্রেন দ্বারা সৃষ্ট হয় এবং একটি ভাইরাসের সংক্রমণ একজন ব্যক্তিকে অন্য তিনটি স্ট্রেন থেকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে না। তাই চারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন একজন। পরবর্তী সংক্রমণগুলি ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুতর রূপের ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম।

তথ্যসূত্রঃ

  1. Jeffrey D. Stanaway, Donald S. Shepard, Eduardo A. Undurraga, Yara A. Halasa, Luc E. Coffeng, Oliver J. Brady, et al. The global burden of dengue: an analysis from the Global Burden of Disease Study Lancet Infect Dis, 16 (2013), pp. 712-723.
  2. Viroj Wiwanitkit (2010) Dengue fever: diagnosis and treatment, Expert Review of Anti-infective Therapy, 8:7, 841-845.
  3. Jóźwiak-Bebenista M, Nowak JZ. Paracetamol: mechanism of action, applications and safety concern. Acta Poloniae Pharmaceutica. 2014 Jan-Feb;71(1):11-23. PMID: 24779190.
  4. Graham, G.G., Davies, M.J., Day, R.O. et al. The modern pharmacology of paracetamol: therapeutic actions, mechanism of action, metabolism, toxicity and recent pharmacological findings. Inflammopharmacol 21, 201–232 (2013).
  5. Webster DP, Farrar J, Rowland-Jones S. Progress towards a dengue vaccine. The Lancet infectious diseases. 2009 Nov 1;9(11):678-87.

আমি মোঃ নাইমুর রহমান, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসী বিভাগে মাস্টার্স কোর্সে অধ্যয়ন করছি। এর আগে একই বিভাগ থেকে আমি আমার বি.ফার্ম(প্রফেশনাল) ডিগ্রি সম্পন্ন করি। ফার্মেসী বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, স্বাস্থ্য বিষয়ক সাধারণ জ্ঞানগুলো প্রতিটি সচেতন বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জানা উচিত। তাই অনলাইন প্লাটফর্মে লেখালেখির মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিষয়ক নিজের অর্জিত জ্ঞানকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ছড়িয়ে দিতে চাই। 

একটি প্রত্যুত্তর করুন

Your email address will not be published.