গর্ভবস্থায় ওপিওয়েড জাতীয় ঔষধ সেবনে নবাজাতকের নিউনেটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিন্ড্রোম
//

গর্ভাবস্থায় হিরোইন-মরফিন সেবন করলে নবজাতকের উপর তার প্রভাব কি?

গর্ভাবস্থায় ওপিওয়েড জাতীয় ঔষধ সেবনে নবজাতকের নিউনেটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিন্ড্রোম (NAS)

454 বার পড়া হয়েছে

গর্ভাবস্থায় যে কোন ওষুধ সেবনে সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা ভুল ঔষধ সেবনে মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠা সন্তানের দেখা দিতে পারে নানান জটিলতা।

গর্ভাবস্থায়, যদি একজন মা ওপিওয়েড (opiod) জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন তাহলে ওষুধগুলি প্লাসেন্টার মাধ্যমে নবজাতকের কাছে যেতে পারে।

ওপিওয়েড জাতীয় ঔষধের মধ্যে রয়েছে- মরফিন সালফেট, হিরোইন, মেথাডোন হাইড্রোক্লোরাইড, ফেন্টানাইল এবং অক্সিমরফিন হাইড্রোক্লোরাইড ট্যাবলেট, যা প্রধানত তীব্র ব্যথানাশক এবং কিছু ক্ষেত্রে নেশাজাতীয় দ্রব্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।

যেসকল মা তাদের গর্ভাবস্থায় ওপিওয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন তারা এমন একটি সন্তানের জন্ম দেওয়ার ঝুঁকিতে থাকে যা নিওনেটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিনড্রোম (Neonatal Abstinence Syndrome – NAS) অনুভব করে।

নিউনেটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিন্ড্রোম (NAS) কি?

নিউনেটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিন্ড্রোম (NAS) হচ্ছে  নবজাতকের কোন ঔষধের প্রতি নির্ভরশীল অবস্থা যা গর্ভকালীন সময়ে সেবন করা ঔষধ থেকে প্রত্যাহার এর কারনে হয়ে থাকে। এটি নবজাতকের জন্মগত সমস্যা নয় বরং মায়ের ঔষধ ব্যবহার থেকে প্রাপ্ত একটি সিন্ড্রোম। কিছু ক্ষেত্রে নবজাতকটি পুনরায় সেই ওষুধের সংস্পর্শে স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসে এবং NAS-এর লক্ষণ প্রদর্শন করে না।

ওপিওয়েড জাতীয় ঔষধের একটি  প্রধান সমস্যা হল শারীরিক নির্ভরতা অর্থাৎ ঔষধ একবার নেয়া বন্ধ করে দিলে তা পুনরায় নেবার আগ্রহ প্রকাশ এবং কিছু দৈহিক লক্ষণ বা অবস্থার দেখা দেয়া।

যেসকল মায়েরা গর্ভাবস্থায় অবিচ্ছিন্নভাবে ওপিওড ব্যবহার করেছেন হয় অবৈধ ব্যবহার বা ওষুধ-সহায়তা চিকিৎসার (medication-assisted treatment – MAT) মাধ্যমে তাদের সন্তান NAS-এর ঝুঁকিতে রয়েছে, কিন্তু NAS হবেই এই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় নি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৫৫% থেকে ৯৪% নবজাতকের মধ্যে NAS বিকাশ হতে পারে ।

নিউনেটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিন্ড্রোম (NAS)এর লক্ষণ

গর্ভাবস্থায় মায়েরা যখন ওপিওড ব্যবহার করেন, তখন তাদের শিশুরা এর  ওপর নির্ভরশীলতা দেখায়। জন্ম নেওয়ার পরে শিশু তার মায়ের সেবন করা সে ঔষধ  আর পান না, তবে সমস্ত ওষুধ একটি শিশুর শরীর ছেড়ে যেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

NAS-আক্রান্ত শিশুর বেশিরভাগই স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হয় । তাছাড়া তাদের নানান স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। NAS-এর প্রাথমিক লক্ষণগুলি সাধারণত জন্মের পর থেকেই শুরু হয় (২-৩ দিনের মধ্যে) এবং ছয় মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। 

প্রাথমিক লক্ষণ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:

  • শরীর কাঁপানো
  • অত্যধিক কান্নাকাটি এবং অস্থিরতা
  • জ্বর
  • ডায়রিয়া
  • খিঁচুনি
  • ঘুমের সমস্যা
  • খাবার খেতে অনীহা
  • প্রচুর হাঁচি দেয়া
  • শ্বাসকষ্ট

গবেষণা করে দেখা গেছে যে , NAS-এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে নবজাতকের গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে –

  • কানের সংক্রমণের ঝুঁকি 
  • কথা বলায়  অসুবিধা
  • শেখার অসুবিধা
  • কম স্মৃতিশক্তি 
  • হাইপারঅ্যাকটিভিটি

সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে  এ ধরনের লক্ষণসমূহ প্রতিহত করা সম্ভব ।

কিভাবে নিউনেটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিন্ড্রোম (NAS) চিকিৎসা করা হয়?

ওপিওয়েড সেবনে NAS আক্রান্ত  শিশুদের লক্ষণগুলি পরিচালনা করার জন্য পিতা-মাতার নিবিড় যত্ন এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন। NAS-এর চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল পদ্ধতি হল প্রমাণ-ভিত্তিক এবং পরিবার-কেন্দ্রিক যত্ন ইট-স্লিপ-কন্সল (Eat-Sleep-Console) মডেল ।

প্রাথমিক পরিচালনা আসে পিতা-মাতা থেকেই যা শিশুকে আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। সেক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে যা যা অনুসরণ করতে হয় –

  • সরু কাপড়ের ফালি দিয়ে জড়ানো
  • নিরিবিলি জায়গায় বসে শিশুকে স্তন্যপান করানো
  • বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে রাখা 
  • এপাশ-ওপাশ করে দোল খাওয়ানো 
  • বাচ্চার সামনে মৃদু স্বরে কথা বলা 
  • শিশুকে না ঝাকানো 
  • সার্বক্ষণিক বাচ্চার সাথে থাকা 
  • হেরোইনের মতো ওপিওয়েড সেবনকারী মায়েরা তাদের বাচ্চাদের বুকের দুধ না খাওয়ানো।

যদি শুধুমাত্র পিতা-মাতার যত্নের মাধ্যমে NAS  আক্রান্ত শিশুর পরিচর্যা সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে কিছু ঔষধ দেয়া হয়। তন্মধ্যে ব্যথানাশক ঔষধ মরফিন (শিরাপথে), MAT স্বল্প ডোজে দেয়া হয়।

যখন শিশুদের সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখা দেয় তখন তাদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (NICU) চিকিৎসা করা হয়। 

ইট-স্লিপ-কন্ট্রোল (ESC) মডেল:

ইট-স্লিপ-কন্ট্রোল (ESC) মডেল হলো এমন একটি নন-ফার্মাকোলজিক পদ্ধতি  যা নবজাতকের  পর্যাপ্ত স্বস্তি এবং যত্নের ব্যবস্থা করে দেয়, পাশাপাশি শিশুর চিকিৎসা পরিবারের ভূমিকা এবং সংযোগ বৃদ্ধি করে।

ESC-মডেল ব্যবহারের মাধ্যমে  যেমন শিশুর চিকিৎসা অগ্রগতি হয়  ঠিক তেমন চিকিৎসার খরচ কমে যায়।

ওপিওয়েড ব্যবহারের ব্যাধিতে আক্রান্ত মায়ের পরিচর্যা:

NAS আক্রান্ত একটি একটি শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যায় তার আশপাশের পরিবেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । মায়ের ক্রমাগত ওপিওয়েড ব্যবহার, মানসিক অসুস্থতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমিত ব্যবস্থা শিশুর স্বাস্থ্য এবং বিকাশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ওপিওয়েড ব্যবহারের ব্যাধিতে আক্রান্ত মায়েদের নবজাতকের যত্ন নেবার জন্য অতিরিক্ত চাপ কমানোর জন্য বাড়তি সহায়তা প্রদান অত্যন্ত জরুরী। হাসপাতালগুলি কতগুলো বাড়তি নিয়ম বা প্রটোকল অনুসরণ করতে পারে যাতে করে মায়েরা চিকিৎসাধীন শিশুদের সাথে বেশি সময় কাটাতে পারে, এটি ESC মডেলকেও সমর্থন করে। 

এই অতিরিক্ত সহায়তাগুলির মধ্যে রয়েছে – 

  • প্রসবপূর্ব/প্রসবোত্তর কাউন্সেলিং গ্রহণ করা
  • ওপিওয়েড ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ 
  • মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা গ্রহণ 
  • ওপিওয়েড ব্যবহারের ব্যাধিতে আক্রান্ত মায়েদের জন্য একটি সহায়তা গোষ্ঠীতে যোগদান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

শিশুর স্বাস্থ্যের ফলাফলগুলি উন্নত হয় যখন পিতামাতারা ওপিওয়েড ব্যবহারের ব্যাধির জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করেন, পাশাপাশি বন্ধু, পরিবার বা চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সকল সহায়তা পান।

কিভাবে নিউনেটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিন্ড্রোম (NAS) প্রতিরোধ করা যেতে পারে?

রোগ নিরাময় নিয়ে বাংলা একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে- “প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো”। তাই নবজাতকের NAS-আক্রান্ত হবার পূর্বেই প্রতিরোধ করা উচিত এবং প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হল গর্ভবতী মায়ের ওপিওয়েড সেবন বন্ধ করা।

এছাড়াও প্রতিরোধের উপায়গুলো মধ্যে রয়েছে-

  • যদি কোন নারী ওপিওয়েড ব্যবহার করেন এবং বাচ্চা নেবার পরিকল্পনা করেন, তাহলে জন্মনিয়ন্ত্রণ পন্থা অনুসরণ করুতে হবে যতক্ষণ না ওপিওয়েড নেয়া বন্ধ করেন। এই মাধ্যমে ওষুধ থেকে মুক্তি পেতে নারী সময় পাবেন, যা শিশুর মধ্যে NAS আক্রান্ত হবার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে। ওপিয়েড ও এমন অন্যান্য নেশাজাতীয় ঔষধ থেকে সন্তানকে রক্ষা করার এইটাই সবচেয়ে ভালো একটি মাধ্যম।
  • আর যদি ওপিওয়েড সেবনকারী নারী গর্ভবতী হয়ে যায় সেক্ষেত্রেও কিছুটা হলেও NAS প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য চিকিৎসক এবং মনোরোগ-বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। তবে এক্ষেত্রে সম্পুর্ণ ঔষধ ত্যাগ করা সম্ভব না, এতে করে সন্তানের জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই গর্ভধারনের পর ওপিওয়েড এর ডোজ কমিয়ে দেবার মাধ্যমে শিশুর NAS আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
  • নবজাতকের NAS প্রতিরোধ করার জন্য ওপিওয়েড আসক্ত নারীকে পারিবারিক ও সমাজিক সহায়তা দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। যাতে করে সহজে সেসকল নারী ওপিওয়েড সেবন থেকে বেরিয়ে  আসতে পারে।
  • অনেক চিকিৎসক ওষুধ-সহায়ক চিকিৎসা (Medication-Assisted Treatment) বা অন্য পদ্ধতির পরামর্শ দিতে পারেন।
  • ওপিওয়েড ঔষধের প্রভাব এবং ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা মূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা।

তীব্র ব্যথা কমানোতে যেমন ওপিওয়েড ব্যবহারের গুরুত্ব রয়েছে ঠিক তেমনি এর অপব্যবহার হতে পারে নানান ধরনের শারীরিক অবনতির কারণ। তাই নবজাতকের সুস্বাস্থ্য রক্ষার্থে ওপিওয়েড এর সঠিক ব্যবহার এবং প্রয়োজনে ব্যবহার বন্ধ করা আবশ্যক।

রেফারেন্স 

  • Armstrong-Mensah E, Woolcock D, Lee C, Diaz MT. Maternal Opioid Abuse and Neonatal Abstinence Syndrome in the United States. Research in Health Science. 2020;5(4):78-86.
  • Grossman MR, Lipshaw MJ, Osborn RR, Berkwitt AK. A novel approach to assessing infants with neonatal abstinence syndrome. Hospital Pediatrics. 2018;8(1):1-6.
  • Grisham LM, Stephen MM, Coykendall MR, Kane MF, Maurer JA, Bader MY. Eat, Sleep, Console approach: a family-centered model for the treatment of neonatal abstinence syndrome. Advances in Neonatal Care. 2019;19(2):138-44.
  • Kozhimannil KB, Chantarat T, Ecklund AM, Henning Smith C, Jones C. Maternal opioid use disorder and neonatal abstinence syndrome among rural US residents, 2007–2014. The Journal of Rural Health. 2019;35(1):122-32.

আমি তাসফিয়া ভূঁইয়া, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.ফার্মেসী (প্রফেশনাল) বিভাগের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী। নিয়মিত গবেষণাপত্র, ব্লগ পড়া এবং লেখালেখি করা আমার প্রথম পছন্দ। ফার্মেসী বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে স্বাস্থ্য ও ঔষধ বিষয়ক নিজের অর্জিত ক্ষুদ্র জ্ঞান তুলে ধরাই প্রধান লক্ষ্য। ভবিষ্যতে একজন ভালো ফার্মেসিস্ট ও গবেষক হতে চাই।

1 Comment

একটি প্রত্যুত্তর করুন

Your email address will not be published.